বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের ৪ জেলায় একযোগে বড় ধরনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। লালমনিরহাট, নওগাঁ, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ১২৯ জনের বেশি মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং সীমান্ত নজরদারির কারণে এসব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে এসব মানুষের বড় একটি অংশ সীমান্তের শূন্যরেখায় এবং সংলগ্ন এলাকায় আটকে রয়েছে, যা মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে একযোগে এসব ঘটনা ঘটে।
বিজিবি জানায়, তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রতিটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সীমান্তের কয়েকটি স্থানে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিক দফা পতাকা বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
লালমনিরহাট লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মোট ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির তৎপরতায় তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হয়। সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করা হলে এবং স্থানীয়দের সহায়তা পাওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বর্তমানে এসব ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
বিজিবি জানিয়েছে, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সীমান্তে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে অনুপ্রবেশের চেষ্টা না হয়।
নওগাঁ নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া ও কলমুডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় তাদের প্রবেশ রোধ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারতের দিক থেকে কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করে তাদের সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই ১৭ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত টহল জোরদার করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ২৮ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে তারা সীমান্তের শূন্যরেখার সংলগ্ন ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে এবং মৌলিক চাহিদা নিয়ে সংকটে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
বিজিবি জানিয়েছে, তারা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং মানবিক দিক বিবেচনায় সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পঞ্চগড় পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার বড়বাড়ি–প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা প্রবেশ করতে পারেনি। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। সীমান্তে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিল। কোম্পানি পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
বিজিবি জানিয়েছে, পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই গ্রহণ করা হবে না এবং সীমান্তের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, একযোগে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে মোট ১২৯ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে লালমনিরহাটে ৩৩ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৮ জন, নওগাঁয় ১৭ জন এবং পঞ্চগড়ে ১০ জন ছাড়াও আরও কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমানে এসব মানুষের একটি বড় অংশ সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। কেউ কেউ ভারতের অভ্যন্তরে এবং কেউ বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় আটকে আছে। এ অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ সহ্য করা হবে না। অন্যদিকে সীমান্তে চলমান এই পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
একযোগে দেশের একাধিক সীমান্তে বড় পরিসরে অনুপ্রবেশের এই চেষ্টা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে এসব চেষ্টা ব্যর্থ হলেও সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা মানুষের মানবিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সীমান্ত এলাকায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে