গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কারণ একটি স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদপত্রই সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, জনগণের মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র দিবস আমাদের সেই ঐতিহ্য, দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সংবাদপত্র কেবল খবর পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি জাতির বিবেক, ইতিহাসের দলিল এবং সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বহু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সংবাদপত্র শিল্পকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্যপ্রবাহ যেমন দ্রুত হয়েছে, তেমনি ভুয়া খবর ও অপতথ্যের বিস্তারও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে পেশাদার সংবাদপত্রের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ যাচাই-বাছাই করা তথ্যই একটি সুস্থ সমাজ ও সচেতন নাগরিক গঠনের ভিত্তি।
তবে সংবাদপত্র শিল্প আজ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজ, ছাপা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন আয়ের সংকোচন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতায় অনেক সংবাদপত্র টিকে থাকার লড়াই করছে। এর প্রভাব পড়ছে সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষের জীবনে। তাই সংবাদপত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের কার্যকর নীতিগত সহায়তা, কর-সুবিধা, প্রণোদনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে সংবাদপত্রেরও দায়িত্ব রয়েছে বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন করার। সংবাদের সত্যতা যাচাই, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে বিরত থাকা প্রতিটি গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব। জনগণের আস্থা অর্জনই সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সংবাদপত্র দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত—একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমই একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। সরকার, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংবাদপত্র শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক সাংবাদিকতা অব্যাহত থাকুক—এই প্রত্যাশাই হোক সংবাদপত্র দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক: গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী মো. নজরুল ইসলাম।