বিশ্বে মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের উৎপাদন ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ১৮ কোটি ৮২ লাখ (১৮৮.২ মিলিয়ন) টন, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিস অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের খাদ্য হিসেবে মাছ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক উৎসের মাছকে ছাড়িয়ে মৎস্যচাষ বা অ্যাকুয়াকালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত মাছই এখন মানুষের খাবারের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় এটিকে একটি বড় রূপান্তর হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান, যা অন্য অনেক খাদ্য থেকে সহজে পাওয়া কঠিন। বর্তমানে বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে বছরে প্রায় ২০ দশমিক ৭ কেজি মাছ খাচ্ছেন। অনেক উপকূলীয় দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রে মাছই প্রাণিজ প্রোটিনের মূল ভরসা এবং কিছু দেশে মোট প্রাণিজ প্রোটিনের অর্ধেকেরও বেশি আসে মাছ থেকে। বিশ্ব অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও এই খাতের অবদান ব্যাপক।
বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ সরাসরি মাছ ধরা ও মৎস্যচাষের সঙ্গে জড়িত এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা মিলিয়ে প্রায় ৬০ কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভর করছে।
এফএও জানায়, মৎস্যচাষ খাত অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে শুধু চাষের মাধ্যমেই উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৩৩ লাখ (১০৩.৩ মিলিয়ন) টন। ফলে মানুষের পাতে এখন যে মাছ উঠছে, তার সিংহভাগই আসছে চাষ থেকে। উৎপাদনে এশিয়া মহাদেশ এখনো বিশ্বের শীর্ষে থাকলেও বর্তমানে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাতেও মৎস্যচাষ দ্রুত বাড়ছে, যা সেসব অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। অনেক অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত মৎস্যচাষের কারণে পানি দূষণ, মাছের মড়ক বা রোগ ছড়িয়ে পড়া এবং সামুদ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকি না থাকলে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনকে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানির অম্লতা বেড়ে যাওয়া এবং মাছের প্রজাতির বাসস্থানের পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে নির্বিচারে অতিরিক্ত মাছ ধরা। অনেক অঞ্চলেই অতিরিক্ত আহরণের ফলে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি শিকার হচ্ছেন স্থানীয় প্রান্তিক জেলেরা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠী।
সংকটের সমাধানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে এখনই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা কঠোর হস্তে বন্ধ করা, মৎস্য খাতে বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
প্রতিবেদনের শেষাংশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবর্তন ছাড়া এই খাতের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামীতে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও কোটি কোটি মানুষের জীবিকা- উভয়ই চরম সংকটের মুখে পড়বে।
দেশবার্তা/একে