লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাসে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওই ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত ছাত্রের নাম মেহেদী হাসান। সে ওই একাডেমির অষ্টম শ্রেণির আবাসিক ছাত্র ছিল। তার বাবা জিয়া উদ্দিন ও মা শারমিন আক্তারের বাড়ি রামগঞ্জের সোনাপুর বাজার এলাকার রাঘবপুর গ্রামে।
রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
একাডেমির ছাত্রাবাসের আবাসিক শিক্ষক মো. ইসমাইল হোসেন জানান, গত ১৪ জুন কলেজ শাখার এক শিক্ষার্থীর একটি আইফোন হারিয়ে যায়। ছাত্রাবাসের ৪১৪ নম্বর কক্ষের বাসিন্দা মেহেদী হাসান ফোনটি চুরি করেছে বলে অপবাদ দেওয়া হয়।
শিক্ষক ইসমাইলের ভাষ্য, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফোন হারানো ওই ছাত্রসহ ৯ জন জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) শিক্ষার্থী মেহেদীকে ৪১৫ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মারধরের কারণে মেহেদী গুরুতর আহত হয়ে মারা যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল করতে অভিযুক্ত ছাত্ররা মেহেদীর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। ওই সময় হোস্টেলের বেশির ভাগ ছাত্র মাঠে খেলাধুলায় অথবা নামাজে ছিল।
শিক্ষক ইসমাইল আরও বলেন, ‘মাগরিবের নামাজের ঠিক আগে আমরা মেহেদীকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ৯ শিক্ষার্থী ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে গেছে।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল রাতেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। রাত ৮টার দিকে কয়েকশো অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা স্কুলের বাইরে জড়ো হতে থাকেন। রাত ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আবাসিক শিক্ষক ইসমাইলের দাবি, এই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে তিনি পুলিশ নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু বিক্ষুব্ধ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরে লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে রাত ২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ইউএনও আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ও ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সাত দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মেহেদীর মরদেহ নিয়ে রামগঞ্জ থানার সামনে বিক্ষোভ করেন তার স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। পরে পুলিশ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোভ তুলে নেওয়া হয়। আজ বিকেল পর্যন্ত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
নিহত মেহেদীর চাচা জুয়েল রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে আমার নিষ্পাপ ভাতিজাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
রামগঞ্জ থানার ওসি মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছে- মোবাইল চুরির অভিযোগে মেহেদীকে মারধর করা হয়েছিল। তবে শুধু মারধরের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল।
ওসি আরও জানান, এই ঘটনায় আজ বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি, তবে অভিযুক্ত ছাত্রদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির অধ্যক্ষ খন্দকার আবদুল মান্নানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
দেশবার্তা/একে