ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  শনিবার | ২০ জুন ২০২৬ | ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১৫:৫১
চলমান বার্তা:
সংঘাতে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শরণার্থী
শাহিদুল ইসলাম সায়ান
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১৫:০১ আপডেট: ২০.০৬.২০২৬ ১৫:২৭  (ভিজিটর : )
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

বিশ্বের কোনো প্রান্তে যখন গোলার শব্দ শোনা যায়, তখন শুধু একটি যুদ্ধ শুরু হয় না; শুরু হয় অসংখ্য মানুষের ঘর হারানোর গল্প। কেউ রাতের অন্ধকারে সন্তানকে বুকে নিয়ে সীমান্তের দিকে ছুটে যায়, কেউ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজের শৈশবকে বিদায় জানায়। কেউ আবার নিজের দেশের মাটিতে থেকেও হয়ে পড়ে পরবাসী। যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও সহিংসতার এই দীর্ঘ ছায়া আজ বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকটকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখে। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৬ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে নিজ দেশের বাইরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। আরও প্রায় ৬ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং হারিয়ে যাওয়া একটি ঠিকানা।

বিশ্বের মোট শরণার্থীর ৭০ শতাংশেরও বেশি এসেছে মাত্র ছয়টি দেশের সংঘাত থেকে। দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইউক্রেন, সুদান, দক্ষিণ সুদান ও ভেনেজুয়েলা। বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এসব দেশের কোটি কোটি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে।

সিরিয়ার গল্প আজও বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। এক সময়ের প্রাণবন্ত শহরগুলো যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে ৬০ লাখের বেশি সিরীয় নাগরিক শরণার্থী হয়েছেন। তথ্য বলছে, প্রতি চারজন সিরীয়র মধ্যে একজনকে নিজের ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। অনেক শিশু এমনও রয়েছে, যারা জন্মের পর কখনো নিজের মাতৃভূমি দেখেনি।

একইভাবে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কয়েক বছরের মধ্যেই ৬০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটি সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা বাস্তুচ্যুত মানবিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।

আফগানিস্তানেও দীর্ঘদিনের সংঘাত, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তাহীনতা লাখো মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে। বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখ আফগান নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছেন। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সুদান ও দক্ষিণ সুদানে। সংঘাত, দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে।

তবে বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের আলোচনায় বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয় এক বিশেষ কারণে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, বৈষম্য এবং সহিংসতার শিকার হয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রতিদিন সূর্য ওঠে হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। সেখানে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর কাছে জন্মভূমি মানে হয়তো শুধুই বাবা-মায়ের মুখে শোনা একটি গল্প। অনেক শিশুই জানে না তাদের গ্রামের নাম, জানে না নিজের দেশের স্কুলে যাওয়ার অনুভূতি কেমন। তাদের জীবনের বড় অংশ কেটেছে বাঁশ, ত্রিপল ও কাঁটাতারের ঘেরা বাস্তবতায়।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই এমন রাতের স্মৃতি বয়ে বেড়ান, যেদিন তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ মা, কেউ আবার পুরো পরিবার। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তারা নিরাপত্তা পেয়েছেন, কিন্তু এখনো ফিরে পাননি নিজের পরিচয়, নাগরিকত্ব কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলা এই সংকট স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলও দিন দিন কমে আসছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু দেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে কলম্বিয়া, জার্মানি, তুরস্ক, উগান্ডা ও ইরান বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এর মধ্যে কলম্বিয়ায় প্রায় ২৮ লাখ, জার্মানিতে ২৭ লাখ, তুরস্কে ২৪ লাখ, উগান্ডায় ১৯ লাখ এবং ইরানে ১৭ লাখ শরণার্থী অবস্থান করছেন।

পরিসংখ্যান আরও বলছে, বিশ্বের ৬৮ শতাংশ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। অর্থাৎ যেসব দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি মানবিক দায়িত্ব বহন করছে। অন্যদিকে প্রায় ৬৫ শতাংশ শরণার্থী নিজেদের প্রতিবেশী দেশেই আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তার অন্যতম উদাহরণ।

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৪৫ লাখ রাষ্ট্রহীন মানুষের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। রাষ্ট্রহীন মানুষদের অনেকেরই কোনো স্বীকৃত নাগরিকত্ব নেই। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও এই বাস্তবতার অন্যতম বড় উদাহরণ।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তা কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়। নিরাপত্তা মানে আইনি সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কাজের সুযোগ এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। এ বছরের প্রতিপাদ্য -‘যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ থাকে’- এই বার্তাই বহন করে যে নিরাপত্তা ও আশ্রয় পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বলেছেন, ‘পঁচাত্তর বছর আগে বিশ্ব একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- যারা যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা নিপীড়ন থেকে পালাতে বাধ্য হবে, তাদের সুরক্ষা দেওয়ার। সেই প্রতিশ্রুতি আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা কোনো বিশেষ অধিকার হওয়া উচিত নয়। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কেউই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নয়।’

ইউএনএইচসিআরের শুভেচ্ছা দূত এবং সিরিয়ার প্রথম নারী শরণার্থী পাইলট মায়া গাজল বলেন, ‘কেউই স্বেচ্ছায় নিজের সবকিছু পেছনে ফেলে যেতে চায় না। নিরাপত্তা খোঁজার অধিকার মানবতার একটি পবিত্র প্রতিশ্রুতি।’

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাতের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটও আজ মানবতার এক বড় পরীক্ষার নাম। কক্সবাজারের শিবিরে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর স্বপ্ন, সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপে বেড়ে ওঠা এক কিশোরের আকাঙ্ক্ষা কিংবা ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা এক মায়ের অশ্রু- সবকিছুই একই গল্প বলে। সেই গল্প নিরাপত্তার, মর্যাদার এবং একটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার।

দেশবার্তা/এসআইএস/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1781938701_RightPanelSquare.jpg
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।