একটি সোনার জুতো (গোল্ডেন বুট), অথচ সেটির পেছনে ছুটছেন বিশ্বের সেরা সব ফুটবলার। মাঠের লড়াইয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান তিনজনের তীব্র প্রতিযোগিতা। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে সবার ওপরে আছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। তবে পেছন থেকে তাঁকে সমানে হুমকি দিচ্ছেন ফ্রান্সের ভরসার প্রতীক কিলিয়ান এমবাপে এবং নরওয়ের তরুণ তুর্কী আর্লিং হালান্ড।
বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড শেষ হওয়ার আগেই গোল্ডেন বুটের প্রতিযোগিতা দারুণভাবে জমে উঠেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার এবং ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার কোনো আসরে তিনজন খেলোয়াড় প্রথম দুই ম্যাচেই চার বা তার বেশি গোল করলেন।
ফুটবলবিশ্ব গত কয়েক ঘণ্টায় দেখল সেরা কিছু ফরোয়ার্ডের গোল করার এক অসাধারণ প্রদর্শনী। গোল উৎসবের শুরুটা করেছিলেন মেসি নিজেই। আর্জেন্টিনার হয়ে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের গোলরেকর্ড ভাঙেন তিনি। মেসির এই কীর্তির জবাব দিতে দেরি করেননি এমবাপেও। নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ইরাকের বিপক্ষে, যা আবহাওয়াজনিত কারণে বিলম্বে শুরু হয়েছিল, ফ্রান্সের জয়ে দুটি গোল করেন তিনি।
এর কিছুক্ষণ পরেই আসে হালান্ডের পালা। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে জয় উপহার দেওয়ার পাশাপাশি দলের শেষ ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করেন এই গোলমেশিন। চলতি বিশ্বকাপের সমীকরণটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে ভালোর কোনো শেষ নেই। একজন যা করতে পারেন, অন্যজন যেন তার চেয়েও ভালো করার পণ নিয়ে মাঠে নামছেন।
খেলার সবচেয়ে বড় মঞ্চে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রা এখন একের পর এক রেকর্ড ভাঙার প্রতিযোগিতায় মেতেছেন।
ফরাসি ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্স বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, বড় তারকারা সব সময় বল নিজেদের দখলে রাখতে চান। তাঁর ধারণা, এর একটি কারণ হলো তাঁরা শুধু গোল্ডেন বুটের পেছনেই ছুটছেন না, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সর্বকালের রেকর্ডটিও ভাঙতে চাইছেন।
বিশ্বকাপে এতদিন ১৬ গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে ছিলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে। তবে চলমান আসরে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচ শেষে ক্লোসেকে ছাড়িয়ে গেছেন ৩৮ বছর বয়সী মেসি। বর্তমানে ২৮টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ১৮ গোল করে তিনি শীর্ষে রয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, এই আসরে আর্জেন্টিনার করা ৫টি গোলের সবকটিই এসেছে মেসির পা থেকে। তবে এমবাপেও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ১৬টি ম্যাচে ১৬টি গোল করে ইতিমধ্যেই ক্লোসের সমকক্ষ হয়েছেন এই ফরাসি তারকা। তাঁর লক্ষ্য হ্যারি কেইনের মতো একাধিক গোল্ডেন বুট জেতা প্রথম স্ট্রাইকার হওয়া এবং মেসির মোট গোলের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়া।
জুলিয়েন লরেন্সের মতে, সবাই ভাবছে এটি আবারও কিলিয়ান এমবাপে শো হতে পারে, কারণ তিনি মেসির দখলে থাকা অবিশ্বাস্য রেকর্ডটি ভাঙার পেছনে ছুটছেন।
ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন হালান্ডও এই রেকর্ডের দিকেই নজর রাখছেন। এই টুর্নামেন্টেই হয়তো তা সম্ভব নয়, তবে বর্তমান গোলের হার বজায় রাখলে ভবিষ্যতে তিনিও এই দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে থাকবেন। ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নিজের প্রথম দুটি বিশ্বকাপ ম্যাচেই একাধিক গোল করার কীর্তি গড়েছেন। নরওয়ের হয়ে ৫২ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ৫৯, যা এক অবাস্তব পরিসংখ্যান।
স্কটল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালি ম্যাককয়েস্ট আইটিভি-কে বলেন, স্বাভাবিক ফুটবল দক্ষতার দিক থেকে মেসি সবার থেকে এগিয়ে, কিলিয়ান এমবাপে সম্ভবত দ্বিতীয় স্থানে। কিন্তু গোল করার ক্ষেত্রে হালান্ডের জুড়ি নেই। এই খেলোয়াড়দের তুলনা করা অসম্ভব। হ্যারি কেইনও হালান্ডের চেয়ে একজন ভালো অলরাউন্ড ফুটবলার হতে পারেন, কিন্তু জালে বল পাঠানোর ক্ষেত্রে এবং ফিনিশিংয়ের দিক থেকে হালান্ডই সম্ভবত সেরা।
বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় মেসির শীর্ষে ওঠার খবরটি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করলেও, এই টুর্নামেন্টে রেকর্ড গড়ছেন আরও অনেকেই। এমবাপে এখন ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছেন।
অন্যদিকে হালান্ড মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই নরওয়ের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেছেন, আর হ্যারি কেইন ইংল্যান্ডের হয়ে গ্যারি লিনেকারের বিশ্বকাপ রেকর্ডের সমান হয়েছেন। এই চার তারকার সবারই এখন মূল লক্ষ্য থাকবে ফ্রান্সের জাস্ট ফনতেইনের ১৯৫৮ সালের এক টুর্নামেন্টে করা ১৩ গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ডটি ছোঁয়া।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফনতেইন ছাড়া কেবল ১৯৭০ সালে জার্মানির গার্ড মুলার এবং ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির সান্ডর কোকসিস এক বিশ্বকাপে দুই অঙ্কের গোল করতে পেরেছেন।
নতুন ৪৮-দলের ফরম্যাটটি নিঃসন্দেহে খেলোয়াড়দের গোলের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তুলনামূলক নিচের সারির দল বেশি থাকায় বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা নিজেদের মেলে ধরার দারুণ সুযোগ পাচ্ছেন।
তাছাড়া চ্যাম্পিয়ন হতে হলে দলগুলোকে আগের চেয়ে আরও একটি রাউন্ড বেশি খেলতে হবে, যা গোলের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেবে। গোল্ডেন বুটের এই ত্রিমুখী লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দেশবার্তা/একে