তীব্র তাপপ্রবাহে প্যারিসের কানাল সেন্ট-মার্টিন-এর একটি সেতু থেকে এক যুবকের লাফ দেওয়ার দৃশ্য।
‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয়ের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে পুরো ইউরোপ। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বুধবার ইউরোপের প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা প্রত্যক্ষ করবেন, যাদের বড় অংশই ফ্রান্স ও স্পেনের বাসিন্দা।
জার্মান আবহাওয়া অধিদপ্তর ও যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের (জেআরসি) জনসংখ্যা পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, আজ ইউরোপের (তুরস্ক বাদে) বিভিন্ন দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। এতে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন, যা এই মহাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
চলতি সপ্তাহের তীব্র তাপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে ফ্রান্স। গত মঙ্গলবার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডসের পিসোসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এই অঞ্চলের সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু, বিদ্যুৎহীন ৬৮ হাজার বাড়ি
তীব্র গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে অসতর্কতার কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত ফ্রান্সে অন্তত ৪০ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই কমবয়সী। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে ‘এক মর্মান্তিক মহামারি’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া গরম সহ্য করতে না পেরে গাড়ির ভেতর আটকে থেকে দুই শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৫৮টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’ এবং ৩১টি অঞ্চলে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর মেতেও ফ্রান্স।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড গরমে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৬৮ হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
ল্যুভর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ঐতিহাসিক ভবনটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই নয়। ফলে দর্শনার্থীদের জন্য দৈনিক পরিদর্শনের সময়সীমা বিকেল ৪টা পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে দাবদাহ: কোন দেশে কী পরিস্থিতি?
ফ্রান্স ছাড়াও পুরো পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ এখন ওলন্দাজ-আফ্রিকান অ্যান্টিসাইক্লোনের কবলে পড়েছে, যা সাহারা মরুভূমি থেকে গরম বাতাস টেনে আনছে।
স্পেনের উত্তরাঞ্চলে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা ওঠার আশঙ্কায় রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। ইতালির মিলান ও রোমসহ ১৬টি প্রাদেশিক রাজধানীতে তীব্র তাপপ্রবাহের রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের কারণে মিলান ও তুরিনে বিদ্যুৎ বিপর্যয় (ব্ল্যাকআউট) ঘটেছে।
নেদারল্যান্ডসে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বেলজিয়ামে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পূর্বাভাস দিয়ে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। বেলজিয়াম সরকার দেশের প্রবীণ ও শিশুদের অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ওজোন ও হিট প্ল্যান সক্রিয় করেছে।
আগামী সপ্তাহান্তে জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি এই তাপপ্রবাহ দ্রুত পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং হাঙ্গেরির দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে ইউরোপ
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপ মহাদেশটি দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই গ্রীষ্মকালীন এই তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে, যা ইউরোপের পানি সরবরাহে ঘাটতি এবং ভয়াবহ ল্যান্ড স্লাইড বা দাবানলের ঝুঁকি তৈরি করছে। গত বছরও এই তাপপ্রবাহের কারণে স্পেনে রেকর্ড পরিমাণ বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
তবে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহান্ত থেকে বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির মাধ্যমে এই তীব্র গরম থেকে কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে।