পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে মোট ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সংগঠনটির প্রকাশিত অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম জনগোষ্ঠীর সদস্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, ভূমি দখল, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর পৃথক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয় নিয়ে বিতর্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়। জেএসএসের মতে, এই নিয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
তবে একই দিনে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হলে সংগঠনটি আপত্তি জানায়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধিকে এ দায়িত্ব দেওয়া চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জেএসএস আরও দাবি করেছে, দায়িত্ব নেওয়ার ১০২ দিনের মাথায় দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং এরপর নতুন কোনো জুম্ম প্রতিনিধিকে মন্ত্রী করা হয়নি।
মানবাধিকার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
প্রতিবেদনে ১১ মার্চ এক আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি আমরা ১০০ শতাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখি, তাহলে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অনেক কিছু প্রয়োগ করতে দিতে পারব না।
জেএসএসের মতে, এ ধরনের বক্তব্য পার্বত্য অঞ্চলে মানবাধিকার সুরক্ষার পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে।
নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ২৪ ঘটনার অভিযোগ
সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ৫৭ ঘটনার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ২৪টি অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ সময় ২১টি গ্রামে টহল ও অভিযান চালানো হয়েছে এবং নতুন করে ৩৪টি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় সেনা ও বিজিবির যৌথ অভিযান, তল্লাশি, জুমচাষে বাধা, ভূমি দখলের চেষ্টা এবং বসতবাড়ি অপসারণের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা
জেএসএসের প্রতিবেদনে ইউপিডিএফ (প্রসিত), মারমা লিবারেশন পার্টি ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টসহ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ১২টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনায় দুইজন নিহত এবং ২৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, মারধর, হত্যা, গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেএসএস নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
ভূমি দখল ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেটেলার, ভূমিদস্যু ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট ১০টি ঘটনায় ৬৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় চারজন নিহত ও ৪৩ জন আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। খাগড়াছড়ির কমলছড়ি এলাকায় ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বিমল ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা, বান্দরবানের জানালীপাড়ায় হামলায় ১৭ জন আহত হওয়ার ঘটনা এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামবাসীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া লামা, লংগদু, কাউখালী ও টেকনাফের কয়েকটি ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও সহিংসতার ঘটনাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ
জেএসএসের দাবি, বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা ও কিছু চাকমা পরিবারকে লক্ষ্য করে ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা চলছে। আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহনির্মাণ ও সুদমুক্ত ঋণের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, অল্পবয়সী শিশুদের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে অভিভাবকদের অজ্ঞাতে ধর্মান্তর ও পরিচয় পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য ছয় মাসে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ১১টি সহিংস ঘটনার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এতে ১৩ জন নারী ও শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, অপহরণ, হত্যা, যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা রয়েছে। বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনাও প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।
জেএসএসের মূল্যায়ন
প্রতিবেদনের শেষে জেএসএস দাবি করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান সংকটের স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। সংগঠনটির মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।
প্রতিবেদনটিতে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও পরিসংখ্যান সংগঠনটির নিজস্ব তথ্যসংগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অভিযুক্ত পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
দেশবার্তা/একে