মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ায় এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে, তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিট এবং ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে সূচক পতনের জোরালো আভাস পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাদের শেয়ারবাজারে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।
সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পরপরই তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে তা কিছুটা সংশোধন হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.৮৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬.৪০ ডলারে অবস্থান করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৪.৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬৯.৯৯ ডলারে উঠেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ইরান এই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল না করার জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে। জাহাজ-তথ্য বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার বর্তমানে হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরের উন্মুক্ত পানিতে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে। তবে হাতেগোনা কয়েকটি ইরানি ও চীনা জাহাজ আজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, অজ্ঞাতনামা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলোতে আগুন ধরে গেছে। তৃতীয় একটি জাহাজের কাছে বিস্ফোরণ ঘটলেও এর নাবিকেরা নিরাপদ আছেন। চতুর্থ একটি ঘটনা থেকে জাহাজের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলো জিব্রাল্টার, পালাউ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী তিনটি ট্যাংকারে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ দুটি এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
ড্যানিশ শিপিং জায়ান্ট ‘মেয়ার্সক’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করছে। বিকল্প পথ হিসেবে তারা এখন আফ্রিকার ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ (Cape of Good Hope) ঘুরে জাহাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
কেপলারের বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ইরানের হুমকির কারণে কার্যত প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেছে। বিমার ব্যয় হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় আজ পশ্চিমা বিশ্বের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকগুলোতে পতন দেখা গেছে। ওয়ালস্ট্রিটের এসঅ্যান্ডপি ৫০০, নাসডাক কম্পোজিট এবং ডাও জোনস ফিউচার- প্রতিটিই প্রায় ১ শতাংশ করে কমেছে। ইউরোপের ইউরোস্টক্স ৫০ ফিউচার ১.৪ শতাংশ এবং জার্মানির ড্যাক্স ফিউচার ১.৩ শতাংশ নিচে নেমেছে।
তবে তেলের দাম বাড়ায় লাভবান হচ্ছে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলো। এক্সন মবিল ও শেভরনের মতো বড় তেল কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর প্রায় ২ শতাংশ করে বেড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের শেয়ারবাজারে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
বাজারের অস্থিরতা কমাতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ও এর সহযোগীরা (ওপেক প্লাস) দৈনিক উৎপাদন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা। তবে এমএসটি রিসার্চের জ্বালানি প্রধান সাউল কাভনিক মনে করেন, যতক্ষণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হবে, ততক্ষণ বাজারে এই আতঙ্ক বিরাজ করবে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতির পর ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। দুবাই, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
দেশবার্তা/একে