চট্টগ্রামে নিউরোসার্জারি চিকিৎসায় নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেড। হাসপাতালটিতে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া ১০০টি ব্রেন টিউমার অপারেশনের ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য, টিউমারের ধরন এবং অস্ত্রোপচারের ফলাফল নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মু. ইসমাঈল হোসেন।
রোববার (২৮ জুন) পার্কভিউ হাসপাতালের ১২তম তলার কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত ‘শ্রেষ্ঠত্বের একটি মাইলফলক’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. কামাল উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ টি এম রেজাউল করিম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. তানজিলা তাবিব চৌধুরী।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ১০০ জন রোগীর মধ্যে ৫৮ শতাংশ ছিলেন পুরুষ এবং ৪২ শতাংশ নারী। উল্লেখযোগ্যভাবে, মোট রোগীর ১৩ শতাংশ ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর।
টিউমারের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৪৩ শতাংশ রোগীর ছিল বিনাইন প্রকৃতির মেনিনজিওমা। এ ছাড়া ২৪ শতাংশ রোগীর মধ্যে ম্যালিগন্যান্ট গ্লিওমা শনাক্ত হয়। বাকি রোগীরা বিভিন্ন জটিল ক্রেনিয়াল ও স্কাল-বেস টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন।
গবেষণায় আরও উঠে আসে, রোগীদের সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ ছিল মাথাব্যথা, যা ৭২ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে। এ ছাড়া ৪৮ শতাংশ রোগীর বমি, ২২ শতাংশের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ১৯ শতাংশের শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং ১৩ শতাংশ রোগীর খিঁচুনির ইতিহাস ছিল।
অস্ত্রোপচারের ফলাফলও ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। গবেষণা অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ সম্ভব হয়েছে। ১৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ এবং মাত্র ৪ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে আংশিক টিউমার অপসারণ করা হয়েছে।
অপারেশন-পরবর্তী ফলোআপে দেখা যায়, ৬২ শতাংশ রোগীর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং ২৮ শতাংশ রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। যদিও ১০ শতাংশ রোগীর অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটে এবং ১৮ শতাংশ রোগী সাময়িক জটিলতার সম্মুখীন হন, তবুও অপারেশনকালীন বা তাৎক্ষণিক মৃত্যুহার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অস্ত্রোপচারের এক মাসের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ৭ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানের নিউরোসার্জারি কেন্দ্রগুলোর পরিসংখ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডা. মু. ইসমাঈল হোসেন বলেন, “এই ১০০টি কেসের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক প্রি-অপারেটিভ পরিকল্পনা এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, রোগীদের দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি উন্নত নিউরোসার্জারি সেবা টেকসই করতে পৃথক ডেডিকেটেড নিউরোসার্জারি অপারেশন থিয়েটার এবং স্বতন্ত্র নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি নিউরোন্যাভিগেশন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, নিউরো-অনকোলজি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম (এমডিটি) গঠন এবং আধুনিক স্কাল-বেস সার্জারি প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
সেমিনারে গবেষণাপত্রের ওপর আলোচনা করেন নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাঁরা এই গবেষণাকে চট্টগ্রামে নিউরোসার্জারি সেবার মানোন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।
বক্তারা বলেন, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা দেশেই আন্তর্জাতিক মানের নিউরোসার্জারি সেবা দিতে সক্ষম।
প্রতিনিধি/আরএইচ