ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  সোমবার | ৬ জুলাই ২০২৬ | ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ২১:০৪
চলমান বার্তা:
সংকট কাটিয়ে যেভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা ফিরে পেল শ্রীলঙ্কা
দেশবার্তা ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫৭  (ভিজিটর : )

বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট ডেটা গ্রুপ চলতি সপ্তাহে শ্রীলঙ্কাকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ, যা ওই বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের আগের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেতে মাথাপিছু জিএনআইয়ের ন্যূনতম সীমা ৪ হাজার ৪৯৬ ডলার। শ্রীলঙ্কা অল্প ব্যবধানে হলেও সেই সীমা অতিক্রম করেছে।

মাত্র তিন বছর আগে সার্বভৌম ঋণখেলাপিতে পড়েছিল দেশটি। সে সময় বিশ্বব্যাংকই একে স্বাধীনতার পর শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

তাই বলা যায়, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে শ্রীলঙ্কার এই প্রত্যাবর্তন দেশটির ঋণখেলাপি-পরবর্তী সংস্কার কর্মসূচি কার্যকর হওয়ারই স্পষ্ট প্রমাণ।

প্রচলিত স্থিতিশীলতা কর্মসূচি, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন

২০২২ সালের এপ্রিলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয় শ্রীলঙ্কা। সে সময় প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক দায় পরিশোধ স্থগিত করে দেশটি। কয়েকটি কারণ একসঙ্গে মিলে অর্থনীতিকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়ায় দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম ঋণখেলাপি হওয়ার ঘটনা ঘটে।

এর পেছনে ছিল একাধিক নীতিগত ভুল। বড় ধরনের কর ছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যায়। দীর্ঘদিনের ঘাটতি—বড় বাজেট ঘাটতি ও চলতি হিসাব ঘাটতি—মেটাতে দেশটিকে অতিরিক্ত বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এর সঙ্গে ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলা এবং কোভিড-১৯ মহামারি পর্যটন খাতকে একেবারে বিপর্যস্ত করে ফেলে। একই সময়ে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশটির ব্যালান্স অব পেমেন্টে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

একপর্যায়ে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যায়। ফলে জ্বালানি, গ্যাস ও ওষুধের মতো জরুরি পণ্য আমদানির অর্থ পরিশোধেও দেশটি নিজের সক্ষমতা হারায়।

এরপর আসে আইএমএফের ৩ বিলিয়ন ডলারের এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি, যার সঙ্গে ছিল আর্থিক সংযম এবং শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি।

দেশবার্তা/এমআর

পরবর্তীতে সরকার কর সংস্কার বাস্তবায়ন করে, যার ফলে রাজস্বের ভিত্তি বিস্তৃত হয়। লোকসানি ভর্তুকি বন্ধ করতে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা যৌক্তিক করা হয় এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। 

সংকটে থাকা অর্থনীতির জন্য এগুলো ছিল প্রচলিত ব্যবস্থাপত্র। তবে কলম্বো মাঝপথে সরে না গিয়ে কয়েকটি কঠিন বাজেট চক্রজুড়ে এগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করেছে।

শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, "শ্রীলঙ্কা ধারাবাহিকভাবে একগুচ্ছ আর্থিক ও মুদ্রানীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার সমন্বিতভাবে এসব নীতি বাস্তবায়নে কাজ করেছে। এ কারণেই তারা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে পেরেছে।"

ঋণ পুনর্গঠন শ্রীলঙ্কাকে এমন স্বস্তির জায়গা দিয়েছে, যা শুধু সংস্কারের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব ছিল না। বেসরকারি বন্ডহোল্ডার ও চীনের সঙ্গে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং ভারতের ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা শ্রীলঙ্কাকে স্থিতিশীলতা কর্মসূচি ব্যাহত না করেই দায় পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে।

বাহ্যিক সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার এই সমন্বয়ই টেকসই পুনরুদ্ধারকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

স্থিতিশীলতাকে প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিয়েছে পর্যটন ও রেমিট্যান্স

সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রবৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করেছে; আর পর্যটন ও রেমিট্যান্স সেই প্রবৃদ্ধি এনে দিয়েছে।

২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক আগমন ২০ লাখ ছাড়ায়, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। এতে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে যায়, যা সংকটের সময় প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

এরমধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়ে, এতে বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি তুলনামূলক স্থিতিশীল উৎস তৈরি হয়। এ সবকিছুর কারণেই বহিঃখাতের চাপ কমেছে, যে চাপ ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি ধসের অন্যতম কারণ ছিল।

বিস্তৃত শিল্প পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে এসব অর্থপ্রবাহকেই ২০২৫ সালে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক।

নীতির ধারাবাহিকতার বিরল উদাহরণ

এখানে সম্ভবত সবচেয়ে কম আলোচিত বিষয়টি হলো ধারাবাহিকতা। শ্রীলঙ্কা প্রথম ২০১৯ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছিল। পরে সংস্কার কর্মসূচি শিথিল হয়ে পড়া এবং সংকট গভীর হওয়ার কারণে দেশটি সেই অবস্থান হারায়।

এবার স্থিতিশীলতার কাঠামো সরকার পরিবর্তনের পরও টিকে গেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় আসা ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার প্রশাসন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচি নতুন করে খোলার বদলে মূলত তা অব্যাহত রেখেছে।

ড. মুস্তাফিজ বলেন, "তাদের প্রকৃত শক্তি হলো, তারা যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা বাস্তবায়নও করে। এটিই সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয়। রাজাপাকসে যুগের পর সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠাই ছিল বড় কাজ, এবং তারা তা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালোভাবে করতে পেরেছে। এ কারণেই তারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধার—দুটিই অর্জন করতে পেরেছে।"

দেশটির পরবর্তী বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি থেকে। এই উন্নীত অবস্থান কতটা টেকসই হবে তা মূলত সহায়তা ও রেমিট্যান্সের ওপরে নয়, বরং নির্ভর করবে বাণিজ্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতার ওপর।

 দেশবার্তা/এমআর
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1781938701_RightPanelSquare.jpg
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।