ভরা বর্ষায় প্রকৃতি তার রুদ্র রুপ মেলে ধরেছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে আগাম বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লক্ষ মানুষ। বিগত ৪৩ বছরের মধ্যে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে এখানে। আগামী দুতিনদিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
এ পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও নদী-খালের পানি বৃদ্ধিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সাতকানিয়ায়। উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বর্তমানে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাজালিয়া, ছদাহা, কেঁওচিয়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। গ্রামীণ সড়ক, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বসতঘর তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
লোহাগাড়ায় আমিরাবাদ, পদুয়া, আধুনগর, চুনতি, বড়হাতিয়া, পুটিবিলা, কলাউজান, চরম্বা ও সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডলু নদী ও হাতিয়ার খালের ভাঙনে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে একাধিক গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারি বর্ষণে মাটির ঘর ধসে পড়েছে এবং গ্রামীণ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন মনিটরিং সেল চালু করে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করছে।
বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, চাম্বল, শীলকূপ, গণ্ডামারা, খানখানাবাদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গত বুধবার রাতে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসিমপুর এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহণ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
বন্যার পানিতে কৃষিজমি, মাছের প্রকল্প ও বসতভিটা তলিয়ে যাওয়ায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় সুপেয় পানি, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, গতকাল দিনভর ও রাতভর টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া একাধিক স্থানে সাঙ্গু ও ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়েছি। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আপাতত শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উপজেলা প্রশাসন জরুরি জনসচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে নিম্নাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মসজিদের মাইক ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি/আরএইচ