‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা’—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এখন দেশ চালাচ্ছেন আমেরিকার কোষাগার কীভাবে ভরানো যায়, সেই দিকে নজর রেখে। ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা হওয়ার চেয়ে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তির অংশীদার হতেই বেশি আগ্রহী।
‘ট্রাম্প ২.০’ বা তার দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় দেশের সম্পদ থেকে টোল আদায়, শুল্ক আরোপ বা মালিকানা নেওয়ার চেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং পানামা খালের দিকেও নিজের সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টি দিয়েছেন তিনি।
প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো যখন তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সীমান্ত দেয়ালের অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখনই বিশ্ব বুঝেছিল যে, এসব পরিকল্পনা সবসময় ঠিকঠাক কাজ করে না। কিন্তু ট্রাম্পের চোখে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাব হলো এমন এক সম্পদ, যাকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটা যায়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া কার্গো জাহাজগুলোকে মার্কিন সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ শতাংশ টোল আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন—এবং পরে তা থেকে সরে আসেন।
এদিকে, তিনি ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, গণতান্ত্রিক বিরোধীদের কোণঠাসা করে রেখেছেন এবং যে অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে তিনি উৎখাত করেছিলেন, তার অবশিষ্টাংশকেই মদদ দিচ্ছেন।
এছাড়া, কানাডার খরচে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও ডেট্রয়েটের একটি নতুন সেতুর উদ্বোধন আটকে দিয়ে তিনি কানাডার কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছেন। এখন ইউক্রেনের প্রতি বেশ বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছেন। তার মতে, দেশটির ‘বিরল মৃত্তিকা’ বা রেয়ার আর্থ সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এখন ‘অংশীদারত্ব’ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে টোলপ্লাজা
উন্মুক্ত জলাশয়ে টোল বসানোর আইনি প্রশ্ন—এবং ইরান যে আগেই টোল ব্যবস্থা চালু করেছিল, সেই সত্য—একপাশে রাখলে, সুরক্ষার জন্য অর্থ আদায়ের বিষয়টি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক বা সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো মনে হতে পারে।
যাই হোক, এটি শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। এক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প তার অবস্থান পরিবর্তন করে জানান, শিপিং কোম্পানির বদলে এবার উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অন্য ধরনের অর্থ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
টোল আদায়ের প্রস্তাব দেওয়ার একদিন পর মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লিখেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনার ভিত্তিতে আমি ২০ শতাংশ ইউনাইটেড স্টেটস রিইম্বারসমেন্ট ফি বা ক্ষতিপূরণ ফির পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা তারা যুক্তরাষ্ট্রে করবে।’
ট্রাম্প সম্ভবত বোঝাতে চাইছেন, তিনি যে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়েছেন এবং যা এখনও শেষ করতে পারেননি, তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু একটা পাবে।
পেন্টাগন ইরান যুদ্ধের খরচের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব দেয়নি, তবে পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলোর মতে, এর ব্যয় এরই মধ্যে ৪ হাজার কোটি (৪০ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে। আর সাধারণ আমেরিকানরা গ্যাস স্টেশনে গেলেই এই সংঘাতের আর্থিক প্রভাব টের পাচ্ছেন।
লাভের অংশ খুব একটা বেশি নাও হতে পারে
গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প কানাডার খরচে নির্মিত গর্ডি হাউ ব্রিজের মালিকানা মিশিগানের ডেট্রয়েট এবং ওন্টারিওর উইন্ডসরের মধ্যে ভাগাভাগি করার দাবি তুলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল করে তোলেন।
চুক্তি সংশোধনের কারণে সেতুর উদ্বোধন পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, কানাডা আগামী ১৫ বছরের টোল থেকে পাওয়া নিট মুনাফার একটি অংশ একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে ভাগ করবে, যদিও এর বিস্তারিত রূপরেখা এখনও অজানা। কানাডা সরকারের তথ্যমতে, সেতুটি আগামী ২৭ জুলাই খুলে দেওয়া হবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সিটিভির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে নিট শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার খরচ উঠে আসার পরই আমরা মুনাফা ভাগাভাগি করব।’ তিনি আরও বলেন, তাই ভাগ করার মতো খুব বেশি নিট মুনাফা অবশিষ্ট থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ট্রাম্পের দাবির কোনো ভিত্তি নেই
টোল আদায়ের চিন্তা বাদ দেওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে কী ধরনের বিনিয়োগ করবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে তিনি বারবার দাবি করেছেন যে, তিনি বিদেশি রাষ্ট্রগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রায়শই ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনার কথা উল্লেখ করেন।
সিএনএন-এর ড্যানিয়েল ডেল ট্রাম্পের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে এমন বিশাল বিদেশি বিনিয়োগের কোনো প্রমাণ পাননি। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প নিয়মিত এই কাল্পনিক দাবি করে চলেছেন।
ট্রাম্পের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতির মূলভিত্তি ছিল আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ। এগুলো মূলত আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপিত কর। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমেরিকান ভোক্তাদেরই পণ্যের বাড়তি দামের মাধ্যমে এই শুল্কের বোঝা বইতে হয়। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোই এই শুল্ক দেয়।
যাই হোক, সুপ্রিম কোর্ট এ বছর রায় দিয়েছেন যে, সরকারের এই শুল্ক আদায় অনুচিত ছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার সেই অবৈধ শুল্ক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি (৪৯ বিলিয়ন) ডলার ফেরত দিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমদানির ওপর কর আরোপের জন্য তিনি নতুন পথ খুঁজবেন। এদিকে, অবৈধ শুল্ক ফেরত পেতে ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের করা মামলার সংখ্যাও বাড়ছে।
ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্ন
শুল্ক নীতি সরকারি প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনুসরণ করা গেলেও, ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অনেকটাই অস্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসন এ বছরের শুরুতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দেয়। কিন্তু মাদুরো সরকারের বাকি অংশ ট্রাম্প প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং তারা ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
তেল বিক্রির পরিমাণ ও আকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর দেশটিতে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনী মাদুরোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো ট্রাম্পকে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার উপহার দিলেও, বিরোধীদের এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দূর থেকেই বিদ্যমান শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে দেশটির ওপর উচ্চমাত্রার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনিজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট আব্রামস ‘দ্য ফ্রি প্রেস’-এ লিখেছেন, প্রশাসন সংস্কারের বদলে তেলের নিয়ন্ত্রণকেই বেছে নিচ্ছে।
তিনি লেখেন, ‘গণতন্ত্র ও পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়ে ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগ এবং তেল উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। এটি একটি আত্মঘাতী নীতি।’
‘বিরল মৃত্তিকা’ বা রেয়ার আর্থে অংশীদারত্ব থাকায় ইউক্রেনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
গত সপ্তাহে ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প যখন বলেন যে, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি ও লাইসেন্স করার অনুমতি দেওয়া উচিত, তখন তিনি মার্কিন কোম্পানি এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রীতিমতো অবাক করে দেন।
ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের এই উষ্ণ মনোভাবের পেছনে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি তার আগ্রহ কাজ করতে পারে—ইউরোপের কোনো গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নয়।
গত বছর ইউক্রেনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ বিনিয়োগ তহবিলের একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই দেশটিতে এখন আমাদের কিছুটা অংশীদারত্ব রয়েছে। কারণ সেখানে আমাদের কিছু জমিও আছে, খনিজ সম্পদও আছে। এটি সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি এবং বিশ্বের যেকোনো জায়গার তুলনায় সেখানকার মাটি বিরল খনিজের (রেয়ার আর্থ) জন্য সবচেয়ে সেরা।’
তবে চুক্তির বিষয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির অমিল থাকতে পারে। ইউক্রেনীয়রা বরাবরই বলে আসছে যে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের পুরো মালিকানা তাদেরই।
ন্যাটোর কাছে অতিরিক্ত দাবি অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনবে
ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের প্রধান অভিযোগ হলো ইউরোপীয় দেশগুলো পর্যাপ্ত অর্থ দিচ্ছে না—যার কিছুটা সত্যতাও আছে। তবে ট্রাম্প যেভাবে এই অভিযোগ তোলেন, তাতে মনে হয় যেন দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দেওয়া উচিত। অথচ বাস্তবে ন্যাটো দেশগুলোর জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার কথা।
সিএনএন-এর ফরিদ জাকারিয়া সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার কৃতিত্ব ট্রাম্পের প্রাপ্য। তবে এর কিছু অপ্রত্যাশিত পরিণতিও রয়েছে; যেমন এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যেতে পারে। জাকারিয়া বলেন, আগের ব্যবস্থাটি ‘স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-বান্ধব ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া শুরু করেছি, যার ফলে একসময় আমেরিকানরা পুরোনো ন্যাটোকে মিস করবে। কারণ সেটি ন্যায্য ছিল তা নয়, বরং আমেরিকা-কেন্দ্রিক সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল।’
ট্রাম্প যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাকি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছেন, তাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে।
দেশবার্তা/এমআর