ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  রোববার | ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০:১৫
চলমান বার্তা:
এবার রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে বিএনপি অত্যন্ত সতর্ক থাকবে
সাঈদ বারী
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১৫:৫৭  (ভিজিটর : )

ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জন্য নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ দলটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অতীতে যেমন সাফল্য দেখেছে, তেমনি তিক্ত অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তাঁকেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপির ভেতরে তখনও বিতর্ক ছিল, এখনও আছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্যাংক ধর্মঘটে অংশ নেওয়া প্রায় আট হাজার কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন, বিমানবাহিনী প্রধানকেও অপসারণ করেন। কিন্তু নিজের মন্ত্রিসভাকে প্রকাশ্যে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের অভ্যুত্থানের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। সেই ঘটনার পর দেশকে প্রায় নয় বছর সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি করা হয় আবদুর রহমান বিশ্বাসকে। ছোটখাটো গড়নের, নিরীহ স্বভাবের এই মানুষটিকে দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করে, তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড রাষ্ট্রপতিদের একজন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবীবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থানচেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের সক্ষমতার পরিচয় দেন। আমার দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটিই বিএনপির সবচেয়ে সফল সিদ্ধান্ত ছিল।

২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি করা হয় দলের প্রথম মহাসচিব এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ এ কে এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, কিছু রাজনৈতিক অবস্থান এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদ ছাড়তে হয়। ঘটনাটি বিএনপির জন্য সুখকর ছিল না।

এরপর রাষ্ট্রপতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষকনেতা অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তাঁকে অনেকেই সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটে, বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময়, তিনি প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি বলেই বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করে। সেই অভিজ্ঞতাও দলটির জন্য সুখস্মৃতি নয়।

এই চারটি অভিজ্ঞতা বিএনপিকে একটি বিষয় অন্তত শিখিয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল আনুগত্য বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রশ্নও। সে কারণেই এবার রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে বিএনপি অত্যন্ত সতর্ক থাকবে বলেই মনে হয়।

আমার একান্ত ব্যক্তিগত  ধারণা, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং স্পিকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমেদই শেষ পর্যন্ত বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতে পারেন।

এমনটি হলে সেটি মোটেও নজিরবিহীন হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্পিকার থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার উদাহরণ আগেও রয়েছে।

১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রথমে স্পিকার, পরে রাষ্ট্রপতি হন এবং পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্পিকার আবদুল হামিদও রাষ্ট্রপতি হন এবং টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

তাই হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বরং আমার ধারণা, এ বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেকটাই আগেই নেওয়া হয়েছে। স্পিকার হিসেবে তাঁর সংসদ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স সেই সিদ্ধান্তকে আরও শক্তিশালী করেছে।

আসলে রাষ্ট্রপতির প্রকৃত গুরুত্ব সবসময় স্বাভাবিক সময়ে বোঝা যায় না। কিন্তু সংসদ ভেঙে গেলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হঠাৎ করেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলগুলো, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনের মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। সংকটের মুহূর্তে ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতাই তখন সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়।

আমার বিবেচনায়, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সামরিক পটভূমি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সংসদীয় অভিজ্ঞতার কারণে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সেই দায়িত্ব পালনের জন্য শক্তিশালী একজন প্রার্থী।

এ কারণেই আমি মনে করি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে। দলের প্রতি অবদান অবশ্যই বিবেচনায় থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকটে কে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে রক্ষা করতে পারবেন।

সাঈদ বারী: কবি, লেখক। 
প্রকাশনা সংস্থা সূচীপত্র-এর প্রধান নির্বাহী।










মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।