মো. সাহাবুদ্দিনের ‘অসুস্থতাজনিত’ পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের ভার্চুয়াল জগৎ, বিশেষ করে ফেসবুক তুমুল সরব এই ইস্যুতে। রাষ্ট্রপ্রধান কে হতে যাচ্ছেন- তা নিয়ে সাধারণ নেটিজেন থেকে শুরু করে সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজগুলো এখন নানামুখী মতামত, যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিতে মুখর।
ফেসবুকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ও ট্রেন্ডিং নাম হলো বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্টজনদের অনেকেই তাকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চেয়ে সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ড. আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছেন, আমার মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ পদে যোগ্য ব্যক্তি । শেখ হাসিনার দুঃশাসনকালে তিনি মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেছেন, বহুভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি মডারেট, সদাচারী ও সুবক্তা হিসেবে অগ্রগণ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বোঝাপড়ার সম্পর্ক রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনি ছিলেন সন্তানসম একজন। বিএনপিতে উপযুক্ত আরো কেউ কেউ আছেন। তবে আমার মতে, সবদিক বিবেচনায় মির্জা ফখরুল এগিয়ে থাকবেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তিনি সম্ভবত সেরা প্রার্থী।
ব্র্যাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক টাইমলাইনে একটি বিশদ বিশ্লেষণ পোস্ট করেছেন। তিনি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন একজন রাজনীতিক যিনি চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও ভাষা ও আচরণের পরিমিতিবোধ হারাননি। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও তার একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পর একটি টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য তার মতো একজন অভিজ্ঞ ও মার্জিত রাজনীতিকের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দেবে।’
সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একাংশও এই মতকে সমর্থন করছেন। অনেক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন যে, বছরের পর বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন, জেল-জুলুম সহ্য করে দল টিকিয়ে রাখার পুরস্কার হিসেবে মির্জা ফখরুলের এই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে বসা উচিত। বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রোফাইলে তার ছবি সম্বলিত পোস্টের সংখ্যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি।
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামি ফেসবুকে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করার পর ফেসবুকের আলোচনার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। তিনি তার পোস্টে দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি-নির্ধারকদের একাংশের পছন্দের তালিকায় বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নাম গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেন এবং সাংবাদিকদের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান।
ফেসবুকের সিংহভাগ ব্যবহারকারী ‘আমলাতন্ত্রের’ কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করার তীব্র বিরোধিতা করছেন। প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্টরা ফেসবুকে লিখেছেন যে, সাবেক আমলা বা বিচারপতিদের রাষ্ট্রপতি করার অতীত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। তারা প্রায়শই রাজনৈতিক সংকটকালে সাহসী বা জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে এর বিপরীত মতও রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন যে, একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরের একজন দক্ষ প্রশাসক বা আমলা কাম টেকনোক্র্যাট বেশি কার্যকর হতে পারেন, কারণ তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছ, ফেসবুকে বিভিন্ন জনপ্রিয় নিউজ পোর্টালের কমেন্ট সেকশনে সাধারণ নাগরিকরা তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও নাম প্রস্তাব করছেন।
অনেকের মতে, বৈশ্বিক কূটনীতি এবং দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্য। যদিও তিনি সরকার পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তবুও নেটিজেনদের একটি অংশ মনে করে, তাকে যদি একক অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে স্থলাভিষিক্ত করা যায়, তবে বিদেশি রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থাগুলোর আস্থা অর্জন সহজ হবে।
বিএনপির আরেকটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী ফেসবুকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামও প্রস্তাব করছেন। তাদের মতে, বিগত আন্দোলনে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থেকে যেভাবে তিনি দলের কণ্ঠস্বর সচল রেখেছেন, সেই ত্যাগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
খুব অল্প সংখ্যায় হলেও ফেসবুকে বিএনপির পারিবারিক ঐতিহ্য এবং শিক্ষিত পরিচ্ছন্ন নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে ডা. জোবাইদা রহমানের নাম নিয়েও কিছু পোস্ট এবং কমেন্ট চোখে পড়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ফেসবুক পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করলে একদম ভিন্ন একটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। তারা চেনা ছকের বা ঐতিহ্যবাহী প্রবীণ রাজপথের রাজনীতিকদের চেয়ে ‘সংস্কার’ এবং ‘নতুন মনস্তত্ত্ব’-কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা বারবার একই প্রবীণ মুখদের বঙ্গভবনে দেখতে চাই না। গতানুগতিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে এমন কাউকে খোঁজা হোক, যিনি তরুণদের ভাষা বোঝেন, যার কোনো অতীত রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বা বিতর্ক নেই এবং যিনি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে রাষ্ট্র সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনি ও নৈতিক সমর্থন দিতে পারবেন।’
তরুণ প্রজন্মের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা স্পষ্ট করছেন যে, যিনিই রাষ্ট্রপতি হোন না কেন, তার অতীত যেন কোনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা স্বৈরাচারের তোষামোদের ইতিহাসে কলঙ্কিত না থাকে।
অনেকেই রাষ্ট্রপতি পদে একজন নারীকে দেখতে চান। ডা. জুবাইদা রহমানের পাশাপাশি নাম এসেছে মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব আইরিন খানের। তার প্রসঙ্গে সিনিয়র সাংবাদিক নাদিরা কিরণম ফেসবুকে কবিতা আকারে লিখেছেন, দেশের খুঁটি আর রইলো না বুঝি দেশে/গুটি গেছে আগেই প্রভাবশালীদের হাতে/বিরোধী দলের শান্ত থাকাতেই ধারণা আসে/নারী বলে সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ নেই তাতে/ আন্তর্জাতিক মহলে রয়েছে যদিও তার বিচরণ/তাতে কতটা আসবে ফান্ড, কতটা হবে উন্নয়ন?/ কিছু বলার নেই,ভবিষ্যত পানে চেয়ে দেখা ছাড়া/ দেখি তিনি কতটা পারেন, ভাঙতে সকল জরা।
সিনিয়র সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, ‘পদত্যাগ করলেন সাহাবুদ্দিন সাহেব। আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রেসিডেন্ট। তার এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার মতো বিষয়ের অবসান ঘটলো। এতদিন নিশ্চয়ই এই বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এক রকমের ঝামেলায় ছিলেন বলে আমার বিশ্বাস। বহু আগে থেকেই সাহাবুদ্দিন সাহেবের পদত্যাগের ব্যাপারে যথেষ্ট জোরালো দাবিও ছিল। যাই হোক, এখন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।
একটা অনুরোধ রাখবো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপি যথেষ্ট অভিজ্ঞতার পরিচয় দেবে। এর আগে কখনো কখনো এই পদে লোক বসানো এবং তার পরবর্তীতে নানামুখী ঝামেলায় পড়তে হয়েছে বিএনপিকে। মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অনেক কষ্টে পড়েছিলেন একজন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হবে বলে আমরা আশা করি।’
বাংলাদেশে একজন নারীকে রাষ্ট্রপতি করার দাবি জানিয়েছেন লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে একজন নারী রাষ্ট্রপতি হোক। বিএনপি এবং তারেক রহমানের জন্য এইটা একটা ইতিহাস সৃষ্টিকারী গ্রাউন্ড ব্রেকিং এচিভমেন্ট হবে। তিনি আরও লেখেন, এ জন্য দলের বাইরে থেকে কাউকে আনার প্রয়োজন নেই। বিএনপির মধ্যেই অনেক জ্যেষ্ঠ নারী নেত্রী রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের যোগ্য। তবে প্রয়োজনে দলের বাইরের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো নারী ব্যক্তিত্বকেও এ পদে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পোস্টের শেষাংশে পিনাকী ভট্টাচার্য তার ব্যক্তিগত একটি আক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিলো, খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দেখা। সেই সৌভাগ্য তো হলোনা।’
এক কথায় এসব মতামত ও আলোচনার ইতি টেনেছেন সিনিয়র সাংবাদিক শংকর মৈত্র। তিনি লিখেছেন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন এটা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানেন। অযথা কারো নামধাম দিয়ে চামচামি করার দরকার নেই। আপাতত আমেরিকার শুল্ক নিয়ে ভাবেন। বাণিজ্যের খবর আছে।
দেশবার্তা/আরএইচ