চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের তাণ্ডব থামছেই না। একের পর এক ঘটনায় চোখ হারাচ্ছেন যাত্রীরা, ভাঙছে শরীরের হাড়, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। রেলওয়ে পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ঘটনার অধিকাংশের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোররা। তবে কেবল শিশুমনে কৌতূহলই নয়, ট্রেনের জনপ্রিয়তা কমিয়ে সড়কপথে যাত্রী বাড়াতে একশ্রেণীর পরিবহন ব্যবসায়ী লোক দিয়ে পাথর ছুড়ছেন- এমন গুরুতর অভিযোগও পেয়েছে পুলিশ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলওয়ে পুলিশ।
সম্প্রতি ২১ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও জামতৈল স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী ‘দ্রুতযান এক্সপ্রেস’-এ ছোড়া পাথরে ডান চোখে গুরুতর আঘাত পান ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চোখের নিচের হাড় ভেঙে যাওয়া সাব্বিরের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আর নেই। এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে গেছে এক তরুণের ভবিষ্যৎ।
এর আগে পারাবত এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় চিকিৎসক, চালকসহ একাধিক যাত্রী গুরুতর আহত হন।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে পাথর নিক্ষেপে অন্তত অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রায় দুই হাজার ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গত এক দশকে অন্তত ১০-১২ জন মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক শত মানুষ।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজি ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান জানান, পাথর নিক্ষেপকে কেবল শিশুদের দুষ্টুমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রথমবার কোনো শিশু ধরা পড়লে তার অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নিয়ে সতর্ক করা হবে। এরপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একইসঙ্গে পরিবহন ব্যবসায়ীদের কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে যাত্রী ডাইভার্ট করার উদ্দেশ্যে এ কাজ করাচ্ছে কি না, তাও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি বা প্রচার চালিয়ে এটি থামানো যাবে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন, আতঙ্ক তৈরির মূল কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথগুলোতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও ট্রেনের বাইরে বিশেষ ক্যামেরা বসানো জরুরি।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৫০০ যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করলেও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে মাত্র অর্ধেক ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন সম্ভব হচ্ছে। রেলওয়ে পুলিশের চাহিদানুযায়ী ৫ হাজার জনবলের বিপরীতে রয়েছে মাত্র আড়াই হাজার সদস্য। পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভিভাবকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
দেশবার্তা/একে