রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ অভিযোগ দাখিল করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে তৎকালীন সরকারের পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়। কিন্তু সে সময় এ ঘটনায় কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হলে একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয় এবং তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, তদন্তে উঠে এসেছে যে, একটি ধর্মীয় সংগঠনকে দমন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা পরিচালিত হয়েছিল। তদন্তে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’, হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মোট ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
অভিযোগপত্রে দুটি ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি ৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে ৩২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এবং অন্যটি পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(সি) ধারায় এ দুটি ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন হত্যাকাণ্ডকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তদন্তে এসব কর্মকাণ্ডকে অপরাধে সহায়তা (অ্যাবেটমেন্ট) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কারণে ‘সমীকরণ’ নামে একটি সম্প্রচার এবং একাত্তর টেলিভিশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুব উল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ, বাহাউদ্দিন নাছিম, লতিফ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ডা. ইমরান এইচ সরকার, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক এনটিএমসি প্রধান জিয়াউল আহসানসহ মোট ৪১ জন।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, শেখ হাসিনা ও তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্যরা বৈঠক করে হেফাজতের সমাবেশ ভণ্ডুলের পরিকল্পনা করেছিলেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রেখে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মধ্যরাতে চারদিক থেকে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড, গ্রেনেড ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে যতটুকু নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই ৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তা অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেওয়ার পাশাপাশি পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। আগামী ১৬ আগস্ট পরোয়ানা বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে ট্রাইব্যুনালের কাছে স্পিডি ট্রায়ালের আবেদনও জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
দেশবার্তা/আইএসআই/একে