দেশের বাজারে থাকা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঘটনার সত্যতা ও ঝুঁকি যাচাইয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও বিএসটিআই’র বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
স্বাস্থ্য সচিব ও বিএসটিআই কর্তৃপক্ষকে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে থাকা টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক রোধে কেন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। এর আগে গত সোমবার (২৭ ২৭ জুলাই) বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে জনস্বার্থে তিনি এ রিট আবেদনটি করেন। রিটে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বাণিজ্য সচিবসহ বিএসটিআইয়ের সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় টুথপেস্টে এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি রবিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিও কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত ১৯টি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’তে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। দেশে তৈরি ২৫টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২২টিতেই এই কণা পাওয়া গেছে। এছাড়া শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেই মিলেছে বিপজ্জনক এই মাইক্রোপ্লাস্টিক।
ইএসডিও-র তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেলে’- প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি কণা। জরিপ অনুযায়ী এই টুথপেস্টটি ৩৫.৬ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করে থাকেন।
প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ক্লোজ আপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশে ১৬০টি করে কণা পাওয়া গেছে। কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলাতে (স্ট্রবেরি) ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি এবং পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে কণা পাওয়া গেছে।
এছাড়া সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি কণা এবং পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট, হোয়াইট প্লাস রেড, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল, সিগন্যাল হোয়াইটেনিং, মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি) ও মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলায় ৬০টি করে কণা পাওয়া গেছে।
অপরদিকে এএম.পিএম. হারবাল, মেডিপ্লাস ডিএস, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক, মেরিল বেবি (অরেঞ্জ), ম্যাজিক হারবাল, মেসওয়াক ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশেতে ৪০টি করে এবং ডেন্টিন জেল, পেপসোডেন্ট কিডস (অরেঞ্জ), ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট, ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেল ও হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভে পাওয়া গেছে ২০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা।
পরীক্ষিত ৩৪টি নমুনার মধ্যে ৮টি টুথপেস্টে কোনো ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো- প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার, জেনফ্রেশ, প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো), সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল, কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ, ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি, কোডোমো (অরেঞ্জ) এবং কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট।
গবেষকদের মতে, টুথপেস্টে প্রতিনিয়ত মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ- দুটোর জন্যই মারাত্মক হুমকি। দ্রুত নীতিগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ না নিলে তা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
দেশবার্তা/একে