ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার তিন দিন পর উদ্ধারকারীরা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩০ জনে।
এদিকে ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘৭২ ঘণ্টার সময়সীমা’ শেষ হয়ে আসছে। অথচ এখনও ৫১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। গত বুধবার লা গুয়াইরা উপকূলীয় এলাকায় রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্ধারকারী দলের অভাব থাকায় ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ মরিয়া হয়ে খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজছেন। সাহায্যকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, উদ্ধারকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সরকার একটি শক্তিশালী উদ্ধার অভিযানের চিত্র তুলে ধরলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ- সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খুব কম সরকারি উদ্ধারকারী দল দেখা গেছে।
জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বলেছেন, ‘উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মানুষই এক একটি অলৌকিক ঘটনা। এই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা নিয়ে আমরা কিছুই লুকাব না।’
লা গুয়াইরায় সরকারি বাহিনীর সদস্যরা বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করেছেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, মানুষকে জীবিত উদ্ধারের এই সংকটময় মুহূর্তে তার সরকার সর্বাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে। ডিজিটাল ডেটাবেসে মানুষ তাদের হাজার হাজার স্বজন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে এই সংখ্যার মধ্যে এমন অনেকে থাকতে পারেন যাদের সঙ্গে ফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, আবার কিছু তথ্য দুবারও গণনা করা হয়ে থাকতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) জানিয়েছে, এই দুর্যোগে প্রায় ৬.৭৬ মিলিয়ন (৬৭ লাখের বেশি) মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে কেবল রাজধানী কারাকাসেই রয়েছে দুই মিলিয়ন মানুষ।
আইওএম-এর মহাপরিচালক অ্যামি পোপ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিরাপত্তার খোঁজে মানুষ স্থান পরিবর্তন করায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বাড়বে, তা এখনই স্পষ্ট। জীবনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে দাঁড়ানো এখন অপরিহার্য।’
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আঞ্চলিক পরিচালক লয়স পেস বলেন, মানুষ আতঙ্কে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে।
শনিবার ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ১ হাজার৬০০ জন বিদেশি উদ্ধারকর্মী এসেছেন।
তবে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির ভেনেজুয়েলা পরিচালক নিকোল কাস্ট কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘উদ্ধারকারীরা এখন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের শেষ কয়েক ঘণ্টায় রয়েছেন। ৭২ ঘণ্টা এমন একটি সময়সীমা, যার মধ্যে আমরা জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা করি।’
নিকোল কাস্ট আরও বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা এমনিতেই মানবিক সংকটের মধ্যে ছিল, তাদের সিভিল প্রোটেকশন সার্ভিসের সম্পদ সীমিত। বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো আসলেও ঘাটতি রয়েই গেছে এবং অনেক মানুষই সম্ভবত ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে যাবে।’
কারাকাসের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চাকাও থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা নোরিস সোতো জানিয়েছেন, জীবিতদের পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভারী যন্ত্রপাতি ও ড্রিল ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এখনো চলছে, কিন্তু উদ্ধারকারীদের মতে এই মুহূর্তে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
সোতো আরও জানান, বিশেষ করে লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রিয়জনদের খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরো ব্যবস্থাপনা এতটাই অগোছালো যে, সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছেন তারা জানেন না তাদের আত্মীয়রা কোথায় আছেন, কিংবা যাদের মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে।
দেশবার্তা/একে