ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  রোববার | ২৮ জুন ২০২৬ | ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ২১:০৬
চলমান বার্তা:
হাওর পর্যটনে সুনসান নীরবতা: বিপন্ন তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন ও আমাদের অর্থনীতি
আবু রায়হান সরকার
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১৭:৫৭  (ভিজিটর : )
আবু রায়হান সরকার

আবু রায়হান সরকার

বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সুনামগঞ্জ পৌঁছে একবার বোটে উঠতে পারলেই যেন সব ক্লান্তি হাওয়া। দু'টো দিন ভরপুর খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, কবিতা আবৃত্তি কিংবা প্রকৃতির কোলে কেবলই অলস ঘুম—এ এক অন্যরকম নাগরিক মুক্তি।

​প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি হাওরের টলটলে পানিতে গোসল আর সাঁতার কাটার এই সুযোগ সবসময় মেলে না। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বর্ষার জল মিলে হাওর টইটম্বুর থাকে বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস। ফলে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়টায় হাওর ভ্রমণের ধুম পড়ে যায় পর্যটকদের মাঝে।

​বিগত ৪-৫ বছরে হাওরের দৃশ্যপট বদলে গেছে। বদলে গেছে এর সৌন্দর্য এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা। যার সুবাদে হাওর-নির্ভর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে ব্যাপকভাবে। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিয়াসীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই অঞ্চল, বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওর।

​কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাওর এখন কানায় কানায় পূর্ণ, অথচ নেই কাঙ্ক্ষিত পর্যটক। বিগত বছরগুলোতে এই সময়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, মিঠামইন কিংবা নিকলি হাওর যেখানে পর্যটকদের কোলাহলে মুখরিত থাকত, সেখানে এবার বোটচালকদের কোনো ব্যস্ততা নেই। সবাই যেন এক অলস ও উৎকণ্ঠাময় সময় পার করছেন। ভরা মৌসুমে পর্যটন খাতের এমন স্থবিরতা আমাদের অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

​দেশের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করতে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ গড়ে তুলেছিলেন আধুনিক ‘হাউজ বোট’ সংস্কৃতি। সময়ের সাথে সাথে চমৎকার সেবা প্রদানের মাধ্যমে এই হাউজ বোটগুলো পর্যটকদের শতভাগ আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফলস্বরূপ, এক দশক আগেও যা ছিল কেবল ব্যাকপ্যাকার্স বা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের গন্তব্য, সেই টাঙ্গুয়ার হাওর আজ সব বয়সী ও সব পেশার মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে অন্যতম সেরা আকর্ষণ।

​হাউজ বোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাইমুল হাসান এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ​‘আমরা নিজেদের করপোরেট ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে দেশের পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে এসেছিলাম। কিন্তু এই শিল্পের অবস্থা দিনে দিনে নাজুক থেকে নাজুকতর হচ্ছে। সময়, শ্রম, মেধা আর অর্থ বিনিয়োগ করে আমরা এখন টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছি। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাকে চাঙ্গা করতে পর্যটন খাত নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। অন্যথায় বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যাবে।’

​নাইমুল হাসানের মতো প্রায় অর্ধশত এনার্জেটিক তরুণ, যারা দেশের পর্যটনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন, তাদের অন্যতম আইকন ইমরানুল আলম। সাজেক থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিন—দেশের প্রায় প্রতিটি প্রধান পর্যটন গন্তব্যে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ করে চলেছে ইমরান ও তার টিম। আজ যদি বাংলাদেশের পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তবে এই তরুণদের মহামূল্যবান মেধা ও সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ইমরানুল আলমরা সাধারণ কোন তরুণ নন; নিজেদের ক্যারিয়ারের মায়া ত্যাগ করে তারা পর্যটনের টেকসই উন্নয়নে ঢেলে দিয়েছেন নিজেদের সর্বোচ্চ পুঁজি ও শ্রম।

​এই চরম সংকটের মাঝেও ইমরানুল আলম ও তার টিম অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাবাদী। তাদের বার্তা স্পষ্ট, ​‘আমরা কেবল ব্যবসার উদ্দেশ্যে পর্যটনে আসিনি, এসেছি দেশের সৌন্দর্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে এবং অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে। বর্তমান স্থবিরতা আমাদের ভাবিয়ে তুললেও আমরা হাল ছাড়তে রাজি নই। সংকট সাময়িক, কিন্তু সম্ভাবনা চিরন্তন। আমরা বিশ্বাস করি, তরুণদের এই মেধা, শ্রম আর সততাকে যদি রাষ্ট্র সঠিক মূল্যায়ন করে, তবে পর্যটনই হতে পারে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় হাতিয়ার।’

​তরুণদের এই আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং পর্যটন খাতকে এই নাজুক অবস্থা থেকে টেনে তুলতে এখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসা জরুরি। পর্যটনবান্ধব নীতিমালা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে তরুণেরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। সরকারের একটু সচেতন দৃষ্টি ও দূরদর্শী পরিকল্পনাই পারে এই সংকটের সমাধান করতে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলাদেশের পর্যটনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে।

লেখক: আবু রায়হান সরকার 
পরিচালক, ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1781938701_RightPanelSquare.jpg
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।