আজ থেকে ১৭১ বছর আগের কথা। বাংলার ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহ একটি গৌরবময় অধ্যায়। প্রতি বছর ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস দেশে পালিত হয়ে আসছে। ১৮৫৫ সালের এই দিনে সিধু মুর্মু ও কানহু মুর্মুর নেতৃত্বে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান শুরু করে। এটি শুধু একটি বিদ্রোহ ছিল না; বরং অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের জন্য নিপীড়িত মানুষের আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সাঁওতাল পরগনা, রাজমহল পাহাড় ও হাজারীবাগ অঞ্চলে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহের দাবানল পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহার (ভাগলপুর) এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলা পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাঁওতালরা ব্রিটিশ শাসকদের নানা বৈষম্যমূলক নীতির শিকার হয়। সে সময় জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচার, অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ঋণের ফাঁদ এবং ভূমি থেকে উচ্ছেদের কারণে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার জন্য তারা সংগঠিত হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সিধু ও কানহু মুর্মুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল ঐক্যবদ্ধ হয়ে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর গণভিত্তি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে। তারা বিশ্বাস করত যে, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা নৈতিক দায়িত্ব। যদিও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি, তবুও এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। হাজার-হাজার সাঁওতাল শহীদ হলেও তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার সাঁওতালদের সমস্যা ও অধিকার বিষয়ে কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়।
সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত। এটি প্রমাণ করে যে, সংগঠিত জনশক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
বর্তমান বাংলাদেশে সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
আজকের দিনে সাঁওতাল বিদ্রোহের চেতনা আমাদের শিখায় যে, কোনো ধরনের বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এই চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সিধু, কানহু এবং অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা অর্জনের জন্য সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না।
শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা অর্জনের জন্য সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসে আমরা সেই বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, দেশের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত হবে। তাহলেই সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়িত হবে এবং একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
সাঁওতালদের প্রধান ও অন্যতম সমস্যা হলো ভূমিহীনতা। ঐতিহাসিকভাবে কৃষিভিত্তিক এই জনগোষ্ঠী প্রভাবশালী মহাজন ও ভূমিদস্যুদের চক্রান্ত, জাল দলিলের কারণে অনেক সময় নিজেদের পৈতৃক জমি হারাচ্ছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের পানির অভাব ও বনজ সম্পদের অধিকার খর্ব হওয়ায় তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে হয়।
একসময় যথেষ্ট জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণও নিজেদের জমি হারিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আরেক দফা বাস্তুচ্যুত হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা। প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র, মামলা-হামলার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে ভূমিহীন হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়। এছাড়া মাঝে-মধ্যে গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে দেখা যায়।
আজ এই দিনে সবার হোক অঙ্গীকার—সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসী জনগণের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তাঁদের উন্নয়নে সকল দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বৈকি।
লেখক: মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী