গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার সড়কের একটি অংশ নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় ধসে পড়ার ঘটনায় পরিকল্পনা ও নকশাগত ত্রুটির কথা স্বীকার করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন।
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৫টায় প্রতিমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত রাজাবাড়ি-দমদমা সড়ক পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে বিশেষ নজরদারি এবং কাজের মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুরো সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। এর মধ্যে নদী, খাল ও ক্যানেলসংলগ্ন অংশ প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিটার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাত্র ৮৩ মিটার। বাকি অংশ আগের নকশা অনুযায়ী ঠিক আছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটির নিচের স্তর দুর্বল হওয়ায় সড়ক ধসে গেছে। এজন্য নতুন নকশা করা হয়েছে। বড় ধরনের পাইলিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, কোথাও সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারে অনিয়ম হলে গণমাধ্যমকে তা তুলে ধরতে হবে। গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। তবে এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত তাঁর কাছে কোনো অনিয়মের তথ্য আসেনি বলেও জানান তিনি।
এর আগে গত ২৯ জুন এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মো. সাদেকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সড়কটির প্রাথমিক নকশা ও পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকার কারণেই নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই সূতি নদীসংলগ্ন অংশ ধসে গেছে।’
তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ স্থায়ীভাবে সংস্কারের জন্য নতুন নকশা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির নকশা বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল উত্তোলনের পর সংস্কার ব্যয় কোন খাত থেকে বহন করা হবে—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন ‘তিন মাসেই ধস ৯ কোটির সড়কে’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত ও পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়ন থেকে প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দমদমা পর্যন্ত সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২০২১ সালে সাড়ে ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়। মেসার্স সালাম ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয় ২০২৬ সালে। নির্মাণ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সূতি নদীসংলগ্ন চিনাশুকানিয়া এলাকায় সড়কের একটি বড় অংশ দেবে যায়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং নদীতীরে বসানো ব্লকও ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা ও নকশাগত ত্রুটির বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে স্বীকার করার পর প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি এবং দায় নিরূপণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিদর্শনের সময় গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস. এম. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধি/আরএইচ