বিশ্বের ৫৯টি দেশে পরিচালিত এক সমন্বিত অভিযানে মানবপাচার চক্রের এক হাজারের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের নেতৃত্বে ‘অপারেশন গ্লোবাল চেইন’ নামের এই অভিযানে যৌন নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অভিযানকালে মোট ২ হাজার ৭০ জন ভুক্তভোগী বা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৩৪ জন সরাসরি মানবপাচারের অভিযোগে এবং ৬৯০ জন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণা চক্রে কাজ করতে ভুক্তভোগীদের পাচারকারী একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং ইউরোপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রলোভন দেখিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌনকর্মে বাধ্যকারী একটি চক্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোল এবং ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের সহযোগিতায় পরিচালিত এ অভিযানে মানবপাচারের নতুন রুট ও কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ইউরোপে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে লাতিন আমেরিকার নাগরিকদের পাচারের প্রবণতা বাড়ছে। তাছাড়া শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের প্রায় ১০ শতাংশই আমেরিকা অঞ্চলের অপ্রাপ্তবয়স্ক, যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
ইন্টারপোল জানায়, ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ ৪০৬ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করেছে, যাদের মধ্যে ৮৩ জন ব্রাজিলীয় এবং ৩২৩ জন বিদেশি নাগরিক। একটি আন্তঃদেশীয় চক্র তাদের কম্বোডিয়ায় পাচার করে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জোরপূর্বক যুক্ত করেছিল। এছাড়া পলাতক সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের বিশেষ নোটিশ জারি করা হয়েছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনার পুলিশ বলিভিয়ার দুই শিশুকে উদ্ধার করেছে, যাদের একটি মুদি দোকানে জোরপূর্বক কাজ করানো হচ্ছিল। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেলজিয়ামেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের বন্দি রেখে বেলজিয়াম ও ফ্রান্সজুড়ে যৌনকর্মে বাধ্য করার অভিযোগে একটি মানবপাচার চক্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ১৭ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ৮ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ অভিযানে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অংশ নেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ একাধিক দেশ এই সমন্বিত অভিযানে যুক্ত ছিল।
ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের অধিকাংশকেই যৌনকর্মে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে পাচার করা হয়েছে। এছাড়া ২০ শতাংশকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে, ১১ শতাংশকে জোরপূর্বক শ্রমে এবং ২ শতাংশকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের ইতিমধ্যে নিজ নিজ দেশের সুরক্ষা ও সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ অভিযানের ভিত্তিতে ৪৬৫টি নতুন তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আরও ২০১ জন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
ইন্টারপোলের মহাসচিব ভালদেসি উরকিজা বলেন, মানবপাচার এখনো সংগঠিত অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম লাভজনক ও বিস্তৃত অপরাধ, যা প্রতিবছর অবৈধভাবে বিপুল অর্থের লেনদেন সৃষ্টি করে। এই অপরাধ ভুক্তভোগীদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধী চক্রগুলো ভেঙে দিতে দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার কার্যকারিতা এ অভিযানের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।
দেশবার্তা/একে