এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ঘিরে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশের পরও কারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারা এই আন্দোলনকে পুঁজি করে ফায়দা নিতে চায়, তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থা। ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের নানা মহলের সম্পৃক্ততার আভাস পেয়ে কয়েকটি কেস স্টাডি ও প্রযুক্তিগত চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে একাধিক টিম।
একই সঙ্গে আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিট। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ছাত্রদের এ ধরনের আন্দোলনের পেছনে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উসকানির অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারকে বিব্রত করতে ও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে মহল বিশেষ পানি ঘোলা করে ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টা করছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, দৃশ্যমান আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী নয় বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। তবে সারা দেশে দু-একটি জেলা এবং ঢাকার কয়েকটি স্পট ছাড়া আন্দোলনকারীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। ফলে বিষয়টিকে বড় সংকট মনে করছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্দোলন চলাকালীন বিভিন্ন স্পটের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫ থেকে ৭টি নির্দিষ্ট মুখ অত্যন্ত বেপারোয়া ও উসকানিমূলক ভূমিকায় ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আড়ালে থাকা এই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভাইরাল ছাত্রীর বিরুদ্ধে মাইলস্টোন কলেজের জিডি
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি’ বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রুবাইয়া মেহজাবিন সূহি (ইবান) বর্তমানে মাইলস্টোন কলেজের ছাত্রী নয় বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই পরিচয় ব্যবহার করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় কলেজের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে বৃহস্পতিবার ঢাকার তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
জিডির বিবরণ অনুযায়ী, রুবাইয়া বিজ্ঞান বিভাগের (ইংরেজি মাধ্যম) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তবে শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে তাকে ইতঃপূর্বে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। তুরাগ থানা পুলিশ ইতিমধ্যেই এই জিডির তদন্ত শুরু করেছে।
শিক্ষার্থীদের নতুন দুই দাবি ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে বৃহস্পতিবার আন্দোলনের ঘোষণা থাকলেও রাজপথে শিক্ষার্থীদের তেমন সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে দুপুরে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে ‘এইচএসসি ২৬ ব্যাচ’-এর ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করে কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সংবাদ সম্মেলনে ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী রায়াত আহমেদ নতুন আরও দুটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো- সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহু নির্বাচনি (এমসিকিউ) অংশে আলাদাভাবে পাসের বর্তমান নিয়ম বাতিল করে দুই অংশের নম্বর একত্রে বিবেচনা করা এবং অনিবার্য কারণে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তাদের জন্য বিশেষ বা বিকল্প পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নে ভুলের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও দাবি করে তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই অটোপাস চাই না। আমরা পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন চাই। তবে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি যেন শিক্ষার্থীবান্ধব এবং ন্যায্য হয়।’ আন্দোলনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নাকচ করেন তারা।
তদন্ত করছে ডিএমপি
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে কোনো অপশক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফোনালাপের একটি বক্তব্য (এখনকার ছেলেমেয়েরা ফার্মের মুরগি... একটু ভিজলে জ্বর চলে আসে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামে।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাতে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভকালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এর জবাবে বুধবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেও চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া দেশের বাকি ৫৯টি জেলায় নির্ধারিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
দেশবার্তা/একে