ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  বুধবার | ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ২১:০৪
চলমান বার্তা:
খেলাধুলা হোক জাতি গঠনের ভিত্তি
সাঈদ বারী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৯:১২  (ভিজিটর : )

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশু ও তরুণ প্রজন্মের ওপর। তারা যদি সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং সৃজনশীল হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের উন্নয়নও টেকসই হয়। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো খেলাধুলা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলাকে লেখাপড়ার পরিপূরক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে অসংখ্য প্রতিভা অঙ্কুরেই ঝরে গেছে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য কেবল একটি ক্রীড়া আয়োজনের আনুষ্ঠানিক ভাষণ নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া দর্শন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা।

‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২০২৬’-এর সমাপনী উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, একটি সুস্থ, মেধাবী, সুশৃঙ্খল ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলা সরকারের প্রধানতম অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেছেন, সরকার ক্রীড়াকে শুধু শরীরচর্চা বা বিনোদনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে ক্রীড়াকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সময়োপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী। কারণ আধুনিক বিশ্বে ক্রীড়া কেবল মাঠের খেলা নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, প্রযুক্তি এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলই যেন সবকিছুর মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, নেতৃত্বের গুণ, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা কিংবা মানসিক দৃঢ়তার চেয়ে নম্বরকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ খেলাধুলা এমন এক শিক্ষা দেয়, যা কোনো পাঠ্যবই একা দিতে পারে না। একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, পরাজয় মেনে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানো, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতা করা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার যে মানসিকতা, তা খেলাধুলার মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন, খেলাধুলা মানুষকে শৃঙ্খলাবোধ, অধ্যবসায়, নেতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়। বাস্তবেও আমরা দেখি, নিয়মিত খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত শিশুরা আত্মবিশ্বাসী হয়, সামাজিকভাবে বেশি সক্রিয় থাকে এবং মাদক, সহিংসতা কিংবা অপরাধপ্রবণতা থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে থাকে। তাই খেলাধুলায় বিনিয়োগ আসলে ভবিষ্যৎ সমাজে বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। 

কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, খেলার মাঠও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করার যে উদ্যোগ 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস'-এর মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, রাজধানী কিংবা বড় শহরের বাইরে থাকা অনেক প্রতিভাবান শিশু প্রয়োজনীয় সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। তৃণমূলভিত্তিক প্রতিভা অন্বেষণের এই জাতীয় কাঠামো সেই বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে ইতিবাচক হলো, আগামী আসরে টেবিল টেনিস ও ভলিবল সংযোজন এবং অংশগ্রহণকারীদের বয়সসীমা ১০ থেকে ১৪ বছরে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গবেষণা বলছে, শৈশবেই দক্ষতার ভিত্তি তৈরি হয়। তাই যত আগে শিশুদের পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যাবে, তত বেশি দক্ষ ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিকেএসপিতে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার যে ঘোষণা এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে উদ্যোগ গ্রহণই যথেষ্ট নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। মাঠ, প্রশিক্ষক, আধুনিক সরঞ্জাম, ক্রীড়া বিজ্ঞান, পুষ্টি, চিকিৎসাসেবা এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিভা যেন রাজনৈতিক পরিচয়, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে সরকারের এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।

অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তনও সমান জরুরি। এখনো অনেক পরিবার খেলাধুলাকে সময় নষ্ট মনে করে। অথচ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য তরুণ খেলাধুলাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে সাফল্য, সম্মান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে। আমাদের দেশেও সেই বাস্তবতা তৈরি করা সম্ভব, যদি রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

একটি জাতির উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সুস্থ মানুষ, সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ সংস্কৃতিই প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা সেই বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তারই প্রতিফলন। তিনি খেলাধুলাকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ভাবনা বাস্তবে রূপ পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু ভালো খেলোয়াড়ই হবে না, তারা হবে আরও দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক নাগরিক।

বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর হাতে একটি বই যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি খেলার মাঠও। কারণ বই মানুষকে জ্ঞান দেয়, আর খেলাধুলা সেই জ্ঞানকে জীবনের বাস্তবতায় কাজে লাগানোর শক্তি ও চরিত্র গড়ে দেয়। একটি আধুনিক, মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়তে তাই খেলাধুলাকে আর অবহেলার সুযোগ নেই। এটিকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় স্থান দেওয়ার সময় এখনই।

সাঈদ বারী: কবি, লেখক। 
প্রকাশনা সংস্থা সূচীপত্র-এর প্রধান নির্বাহী।


মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।