মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক স্মারকসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষণের জোর দাবি জানিয়েছে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। মূলত গত ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংসের প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও লেখক আবু সাইদ খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের স্থান মুজিবনগর আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ছদ্মবেশী কিছু দুর্বৃত্ত মুজিবনগর কমপ্লেক্সে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে এবং প্রায় ৩০০টির মতো ছোট-বড় ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য থেকে শুরু করে অপারেশন সার্চলাইটের চিত্র এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই স্মারক রক্ষায় এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এক ধরনের নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করেছে। এমনকি এবারের মুজিবনগর দিবসে সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি পালন না করায় এবং কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তার উপস্থিত না থাকায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এসব হামলার পেছনে রয়েছে সেই সব স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যারা এ দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়।
তিনি জানান, বড় বড় স্থাপনায় হামলা হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা গ্রহণ করা হয়নি এবং সংস্কারের কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন, মুজিবনগর সরকারই ১১টি সেক্টরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে অনন্য অবদান রেখেছিল।
বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বিষয়টিকে ইতিহাসের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে যাদের গাত্রদাহের কারণ মুক্তিযুদ্ধ, তারাই আজ ইতিহাস ধ্বংস করতে চাইছে। এদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জন-প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেন তিনি।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন মুজিবনগরকে দেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে সঠিকভাবে সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেন।
দাবিগুলো হলো- অবিলম্বে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সসহ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্থ স্মারকসমূহ পুনঃনির্মাণ করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্মারক, গণকবর, বধ্যভূমিসহ স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; মুক্তিযুদ্ধের স্মারকসমূহে হামলাকারী দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে; যথাযোগ্য মর্যদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর দিবস পালন করতে হবে; মুজিবনগরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘরটির কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সেখানে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে; দলমতের ঊর্ধ্বে নির্মোহভাবে রচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বগাথাঁ পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, দোলন চন্দ্র রায় ও রফিক আহমেদ সিরাজীসহ অন্যান্যেরা।
দেশবার্তা/একে