পাহাড় ও সমতলের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সংস্কৃতি বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সংস্কৃতি বিনিমার্ণ করতে চাই যাতে পাহাড়ের মানুষ না ভাবে আমরা ক্ষুদ্র। যদি আমরা কল্যাণমুখী, উদার ও গণতান্ত্রিক হই, তবে প্রতিটি জনগোষ্ঠী যেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনবোধ নিয়ে টিকে থাকতে পারে, সেই পথটিই আমাদের বেছে নিতে হবে।’
সোমবার (১৮ মে) কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদের ‘আদিবাসী প্রেমিকার মুখ’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ঐতিহ্য প্রকাশন আয়োজিত এই দ্বিভাষিক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন মোস্তফা মুশফিক।
প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, রাষ্ট্রের চোখে কে ক্ষুদ্র বা কে বৃহৎ, সেই বিভাজন থাকা উচিত নয়। একসময় বলা হয়েছিল সবাই ‘বাঙালি’ হয়ে যাও। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীকে জোর করে বিলীন করা যায় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সরকার একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে, যেখানে পাহাড়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘এই বইটি একটি বিশেষ এলাকা, বিশেষ জনগোষ্ঠী এবং তাদের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। একে স্রেফ প্রেমের কবিতা হিসেবে পড়লে চলবে না, এর ভেতরের সংস্কৃতি ও তীব্র ব্যঙ্গাত্মক সংলাপগুলোকে রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে।’
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিশেষজ্ঞ ও গবেষক কুদরত-ই-হুদা বলেন, বইটিতে যত না প্রেম আছে, তার চেয়ে বেশি আছে আদিবাসী জীবনের বিপন্নতা আর বেদনা। জলপাই সেপাই, ঠান্ডা কালো নল, লারমার খুন, সেটলার—এই শব্দগুলোই বলে দেয় কবি এখানে আদিবাসী প্রেমিকাকে পুরো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রূপক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ তাঁর আলোচনায় কাপ্তাই হ্রদ এবং পাহাড়ের ভূমি হারানোর যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে বলেন, একই ভূখণ্ডের নাগরিক হলেও পাহাড়ের মানুষের জীবনের সংগ্রাম একদম আলাদা। এই বইয়ে কবি আদিবাসী প্রেমিকার মুখ দিয়ে পাহাড়ের বঞ্চনার কথাগুলো আমাদের দৃষ্টিতে নিয়ে এসেছেন। এমনকি এখানে কল্পনা চাকমাকে নিয়ে একটি জরুরি প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে।
অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যারা অধিকার নিয়ে কাজ করি, আর কত শান্তির বয়ান দিলে পাহাড়ের আদিবাসী জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে? নিশ্চয়ই আগামীতে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা সে বিষয়ে ভাববেন।
বইটির রচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে লেখক এহসান মাহমুদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী ও বাঙালি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। আবার ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও চাকমা-গারো তরুণরা আমার হাত ধরে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে শামিল হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর সংবিধান রচনার সময় একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কেবল বাঙালির সংবিধান করা হলো।
পার্বত্য চুক্তির পরবর্তী পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে উন্নয়নের নামে ইকো-ট্যুরিজম করা হচ্ছে। যেখানে ‘ইকো’ও থাকবে আবার ‘ট্যুরিজম’ও থাকবে—এই বৈপরীত্যগুলোই আমি কবিতায় আনার চেষ্টা করেছি। ২০২৪ সালের তরুণরা যে ন্যায্যতার বাংলাদেশ চায়, তা মনে করিয়ে দিতেই এই বই।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন ঐতিহ্য প্রকাশনার প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান নাঈম। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কবি, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশবার্তা/একে