মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মহোদয় সমীপেষু,
বিষয়: বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের নৃগোষ্ঠী সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিষয়ে একটি খোলা চিঠি।
মহোদয়,
আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক সম্মান ও শুভেচ্ছা জানিয়েই কলম ধরছি। বিগত দিনগুলোতে আপনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়নস্বরূপ আপনি রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেছেন এবং জাতীয় সংসদের উপপ্রধান অভিভাবক বা ডেপুটি স্পিকারের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। আপনার মেধার গভীরতা কিংবা আইনজ্ঞ হিসেবে আপনার যোগ্যতা নিয়ে কারোরই মনে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু সম্প্রতি ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেত্রকোনায় একটি অনুষ্ঠানে আপনি যেভাবে কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি করেছেন এবং প্রসঙ্গক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে টেনে এনে বাংলাদেশের সামগ্রিক ভূমির মালিকানা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা দেশের সচেতন নাগরিক ও গবেষক সমাজকে গভীরভাবে স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ করেছে। আপনার মতো একজন অভিজ্ঞ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় নেতার মুখ থেকে এমন রাষ্ট্রীয় নীতি ও ঐতিহাসিক সত্য-বহির্ভূত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। একজন সচেতন নাগরিক এবং এই অঞ্চলের ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ের একজন গবেষক হিসেবে গভীর দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এই ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি।
মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, আপনি দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের সমস্ত ভূমির মালিক নাকি তথাকথিত ‘আদিবাসী’রা এবং সমতলের বাঙালিরা তাদের জমি দখল করে বসবাস করছে। এই বক্তব্য কেবল ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ নয়, বরং আমাদের মহান সংবিধান, রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং একাত্তরের লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সার্বভৌমত্বের ভিত্তিমূলে আঘাতের শামিল। আদিবাসী বা উপজাতি সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করার আগে আমাদের পবিত্র সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা, দেশের প্রচলিত আইন, আন্তর্জাতিক বিধিবিধান এবং এই অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।
আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করিবেন। এখানে কোথাও কাউকে ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজেনাস’ (Indigenous) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী, এই ভূ-খণ্ডের মূল নিবাসী বা ‘ভূমিপুত্র’ হলো বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী, যারা হাজার বছর ধরে এই পলিমাটিতে বসবাস করে নিজেদের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান অনুযায়ী এ দেশের সকল নাগরিকের আইনি পরিচয় হবে ‘বাঙালি’। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় সংহতির স্বার্থে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন, যার মাধ্যমে দেশের মূল স্রোতের বাঙালির পাশাপাশি পাহাড়ি ও সমতলের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম-অধিকার ও নাগরিকত্বের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আপনি যে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল চেতনার সাথেই আপনার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকেও আপনার এই বক্তব্য টিকবে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন রয়েছে—আইএলও কনভেনশন-১০৭ এবং কনভেনশন-১৬৯। বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন-১০৭ অনুস্বাক্ষর করলেও সেখানে এদের ‘উপজাতি’ বা ‘ট্রাইবাল’ (Tribal) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, আদিবাসী বা ইনডিজেনাস হিসেবে নয়। আর আইএলও কনভেনশন-১৬৯, যা মূলত আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং তাদের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রে সামরিক স্থাপনা বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ শর্ত যুক্ত করে, বাংলাদেশ তা আজ পর্যন্ত স্বাক্ষর করেনি। এমনকি ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ (UNDRIP) গ্রহণের সময়ও বাংলাদেশ কৌশলগত কারণে ভোটদান থেকে বিরত ছিল এবং স্পষ্ট জানিয়েছিল যে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতি। কারণ, আইএলও কনভেনশন-১৬৯-এর অনুচ্ছেদ ৩০ অনুযায়ী, কোনো দেশে আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া হলে সেই অঞ্চলে তাদের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র কোনো সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা বা নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করতে পারবে না। যদি আপনার বক্তব্য অনুযায়ী রাষ্ট্র এই দাবি মেনে নেয়, তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সীমান্ত এলাকায় তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার নিয়ন্ত্রণ হারাবে, যা রাষ্ট্রকে একটি স্থায়ী ‘মরণফাঁদ’ বা ডেথ ট্র্যাপে ফেলে দেবে।
ঐতিহাসিক ও নৃ-বৈজ্ঞানিক তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো এই মাটির আদি বাসিন্দা নয়, বরং তারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত পরিব্রাজক ও অভিবাসী। চেহারা ও শারীরিক গঠনে তাদের মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য—যেমন চ্যাপ্টা নাক, ক্ষুদ্র চোখ এবং উন্নত গালের হাড় প্রমাণ করে তাদের আদি বংশধারা উত্তর-পূর্ব এশিয়া, তিব্বত বা মঙ্গোলীয় মালভূমি থেকে এসেছে। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত আর. এইচ. এস হাচিনসনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts’ এবং ১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ প্রশাসক ক্যাপ্টেন জে. পি. লুইনের ‘The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো এক যাযাবর জীবনযাপন করত এবং তারা এই ভূ-খণ্ডের আদি বাসিন্দা নয়। উদাহরণস্বরূপ, চাকমা সম্প্রদায় চতুর্দশ শতকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রাজা মেং-সয়া-মনের আক্রমণের মুখে বিতাড়িত হয়ে বান্দরবানের লামা, আলীকদম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মারমারা মূলত সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বর্মি রাজা বোদাওপায়া’র আরাকান দখলের ফলে সৃষ্ট জাতিগত সংঘাতের কারণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এখানে আশ্রয় নেয়। একইভাবে ত্রিপুরাদের আগমন ঘটেছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। চাকমা সম্প্রদায়ের নিজস্ব লেখক বিরাজমোহন দেওয়ানের ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ এবং অশোক কুমার দেওয়ানের ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার’ গ্রন্থেও এই অভিবাসনের সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে।
মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, এখানে একটি গভীর বিস্ময়কর বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। যে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এই নৃগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে এসেছে, সেই মিয়ানমার সরকার তাদের ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘জাতীয় জাতিসত্তা’ বা ‘তাইংয়িনথা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ‘আদিবাসী’ হিসেবে গ্রহণ করেনি। একইভাবে, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ উপজাতি গোষ্ঠী বসবাস করলেও, ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের সংবিধানে তাদের ‘তফসিলি উপজাতি’ (Scheduled Tribes) বলা হয়েছে। ভারতের যুক্তি ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ—ভারতের সীমানায় বসবাসরত সকল নাগরিকই এই মাটির মূল নিবাসী। নির্দিষ্ট একটি অংশকে ‘আদিবাসী’ বললে বাকি বিপুল সংখ্যক নাগরিককে পরোক্ষভাবে ‘সেটলার’ বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি থাকে, যা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পরিপন্থি। ভারত আজ পর্যন্ত আইএলও কনভেনশন-১৬৯ স্বাক্ষর করেনি। এখন প্রশ্ন জাগে, ভারত ও মিয়ানমারে যদি তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি না থাকে, তবে বাংলাদেশে তারা এই দাবি তোলে কোন যুক্তিতে? আর আপনিই বা কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের এই ভূমির আদি মালিক বানিয়ে দেশের প্রায় ১৮ কোটি বাঙালিদের দখলদার হিসেবে চিত্রিত করলেন? এটি কি আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরণের চরম অবমাননা নয়?
২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯। যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। তাহলে আপনি মনে করছেন ৯৯শতাংশ মানুষ এই বঙ্গে বহিরাগত? ১ শতাংশ নৃগোষ্ঠির মানুষরাই এই বাংলার আদি মালিক? আপনার বক্তব্যেতো তাই মনে হয়!
প্রকৃতপক্ষে, এই ‘আদিবাসী’ শব্দটির পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আন্তর্জাতিক কিছু দাতাগোষ্ঠী এবং স্বার্থান্বেষী মহলের মদদে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১ শতাংশ ভূমির ওপর থেকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার জন্য ২০০৭ সালেরপর থেকে এই দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই দাবির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। কিন্তু তার পারিবারিক ইতিহাস ও ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেশের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে বড় দাগে সংশয় তৈরি হয়। তার পিতা ত্রিদিব রায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়ে নিজের প্রজাদের ফেলে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। দেবাশীষ রায় নিজেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ‘আদিবাসী অধিকার’ নিয়ে সোচ্চার হয়ে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা সংস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান নিয়ে আসেন, যার বড় অংশই সাধারণ পাহাড়িদের ভাগ্যের উন্নয়ন না ঘটিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট এলিট ও অভিজাত গোষ্ঠীর বিলাসী জীবনযাত্রার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল-১৯০০ এর দোহাই দিয়ে রাজা, হেডম্যান ও কার্বারীদের সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং ভূমির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ ও বৈষম্যমূলক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করা।
আজ পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষ ভূমিহীন ও দরিদ্র হলেও, এলিট সমাজ বংশানুক্রমে বিপুল পরিমাণ জমির মালিকানা ভোগ করছে। তারা প্রথাগত অধিকারের নামে সাধারণ মানুষের ওপর শোষণ চালাচ্ছেন। এই সামন্তবাদী ব্যবস্থার কারণে পাহাড়ের ভূমি ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। সমতলে যেখানে প্রতি ইঞ্চির খাজনা ও মালিকানা সুনির্দিষ্ট এবং ভূমি জরিপ সম্পন্ন, পাহাড়ে সেখানে কোনো ভূমি জরিপই করতে দেওয়া হচ্ছে না। জরিপ হলে এই প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে বলেই তারা প্রথাগত ভূমির দোহাই দিয়ে এর বিরোধিতা করে। যার ফলে রাষ্ট্র প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে হলে পাহাড় ও সমতলের সকল অঞ্চলে অভিন্ন ভূমি আইন ও আধুনিক ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।
মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, কোনো দেশ বা অঞ্চলের মানুষ নিজেদের আন্তর্জাতিক লবিং ও অধিকারের টেবিলে সফল হয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করলে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা বা তাদের ঢালাও সমালোচনা করা আমাদের দৈন্যতা প্রকাশেরই নামান্তর। বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীন ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র। তাই আমাদের নীতি হতে হবে অন্য দেশ বা গোষ্ঠীর অর্জনে ঈর্ষা প্রকাশ না করে, নিজেদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাতে কোনো অপশক্তি আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে না পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী ‘বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতি’র আশ্রয় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রোপাগান্ডা রুখে দিতে আমাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক দলিল ও আইনি যুক্তিগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। দেশের ভেতর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এবং সাধারণ পাহাড়িদের এই ক্ষুদ্র এলিটদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রের মূল ধারার অর্থনৈতিক উন্নয়নে শামিল করতে হবে। বিদেশি অনুদাননির্ভরতা কমিয়ে পাহাড়ে সরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ পাহাড়িরা কোনো ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
আমরা অতীতেও লক্ষ্য করেছি যে, রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততা বা স্থানীয় সুধীজনদের সাথে মতবিনিময়কালে অনেক সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেতৃবৃন্দ অবচেতনভাবেই এমন কিছু শব্দ চয়ন করে ফেলেন, যা হয়তো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত অবস্থানের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তবে আনন্দের বিষয় হলো, বাস্তবতার গভীরতা অনুধাবন করে পরবর্তীতে তাঁরা সবসময়ই রাষ্ট্র ও সংবিধানের মূল স্পিরিটের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ফোরামগুলোতে এ বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সচেতনতামূলক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত দিনে মাননীয় মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মহোদযয়ের বেলায়ও এমন দেখা গিয়েছে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, আপনার এই সাম্প্রতিক বক্তব্যটিও কোনো ভিন্ন বা নেতিবাচক উদ্দেশ্য থেকে নয়, বরং একটি স্থানীয় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাৎক্ষণিক ভাবাবেগের একটি অনভিপ্রেত বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তবুও, আপনার মতো রাষ্ট্রের একজন উচ্চপর্যায়ের সাংবিধানিক অভিভাবক এবং নীতি-নির্ধারকের মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। ফলে, এই অসতর্ক মন্তব্যটি সুদূরপ্রসারী কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টির আগেই রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আপনার অবস্থানটি পুনর্ব্যক্ত করা অত্যন্ত জরুরি ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। কারণ আপনার মতো রাষ্ট্রের একজন শীর্ষস্থানীয় অভিভাবকের কাছ থেকে এমন অসতর্ক বক্তব্য জাতির মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে, যা অনতিবিলম্বে নিরসন হওয়া প্রয়োজন।
মহোদয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল স্তম্ভ এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্পষ্ট অবস্থানের সাথে আপনার এই বক্তব্য কোনোভাবেই খাপ খায় না। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য আপনি গত ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে দলীয় প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনপূর্ব দেওয়া সুনির্দিষ্ট বক্তব্যটি আরও একবার শুনে আসতে পারেন, যেখানে দেশের অখণ্ডতা ও জাতিগত পরিচয়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
অতএব, আপনার প্রতি বিনীত ও সবিনয় অনুরোধ, আপনি নিজের অবস্থান দ্রুত পরিষ্কার করুন। আপনার এই বক্তব্যটি কি কেবলই তথ্যগত অজ্ঞতাবশত নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সমীকরণ রয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেশ ও জাতির সামনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের অবসান ঘটানোই হবে আপনার প্রজ্ঞার পরিচয়। আমরা আশা করি, আপনি এই খোলা চিঠির মর্মার্থ ও দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি অনুধাবন করে রাষ্ট্র ও সংবিধানের অভিন্ন অবস্থানের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করবেন।
আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সফল রাজনৈতিক জীবন কামনা করছি।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক