কাজীপাড়া পুকুরপাড়ের ভাঙা রাস্তার কথা আজকাল খুব মনে পড়ে।
সেই রাস্তায় সন্ধ্যা নামতো ধীরে ধীরে,
যেনো কোনো বৃদ্ধ মুয়াজ্জিন আজানের আগে ক্লান্ত গলায় গলা খাঁকারি দিচ্ছেন।
বৃষ্টির পরে কাদা জমে থাকতো,
আর সেই কাদার পানিতে ভেসে থাকতো ছেঁড়া মেঘ, ভাঙা আকাশ, আর আমাদের ছোটবেলার মুখ।
আমরা তখন তিন বোন চার ভাই ছিলাম,
বাবা বিএডিসিতে চাকুরী করতেন।
আমাদের ঘরের নয় জনের সংসারে বাবার সামান্য বেতনে টানাটানি ছিলো, কিন্তু সেই টানাটানির সংসারেও ভালোবাসা -আদর-শাসন-শ্রদ্ধা ছিলো।
মা পুরোনো শাড়ি কেটে বালিশের কভার বানাতেন।
বাবা সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে নামাজের বিছানায় নিজের মতো করে তসবিহ ঝপতেন, কোরআন পড়তেন, গভীর রাত অবধি নামাজ পড়তেন।
মাঝে মধ্যে বাবার চোখে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেটা শুধু সংসারের নয়, পৃথিবীর।
কাজীপাড়ার মানুষ সবাই সবাইকে চিনতো।
কে কার প্রেমে পড়েছে, কার মেয়ে পালিয়ে গেছে,
কার ছেলে শহরে গিয়ে রাজনীতি শিখেছে,
কার ঘরে চাল নেই, সব খবর বাতাস জানতো।
বাতাস তখন মানুষের চেয়েও বিশ্বস্ত ছিল।
উত্তর মৌড়াইল আর দক্ষিণ মৌড়াইলকে আলাদা করে দেওয়া রেললাইনটা যেন একটা জীবন্ত নদী ছিল।
দিনে বহুবার ট্রেন যেতো, আর আমরা ছুটে যেতাম রেল লাইনপাড়ে দাঁড়াতে।
রেললাইনের চকচকে লোহার গায়ে দুপুরের রোদ পড়লে মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত আগুন বুঝি এখানে এসে জমা হয়েছে।
আমরা পাঁচ পয়সা রেখে অপেক্ষা করতাম ট্রেনের জন্য।
ট্রেন চলে গেলে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া পয়সা হাতে নিয়ে মনে হতো, যাদু বলে যদি কিছু থাকে, তবে সেটাই।
রেললাইনটাকে আমরা ভয়ও পেতাম, আবার ভালোবাসতামও।
কারণ ওটা শুধু পথ ছিলো না, ওটাই ছিল দুই পাড়ার সীমান্ত।
যখন মালগাড়ি যেতো আমরা গুনতাম মনোযোগ দিয়ে একশো বগি ছাড়িয়ে যেতো আর সবাই ভাবতাম এতো বগি নিয়ে ট্রেন যায় তার কস্ট হয়না।
উত্তর মৌড়াইলের ছেলেরা দক্ষিণ মৌড়াইলে গেলে নিজেদের বিদেশে এসেছে মনে করতো।
তবু বিকেল হলেই সবাই এক হয়ে যেতো কাজীপাড়া ঈদগা মাঠে।
ঈদগা মাঠটা শুধু নামাজের মাঠ ছিল না।
ওটাই ছিল আমাদের বিশ্বকাপ স্টেডিয়াম,
আমাদের মিছিল, আমাদের প্রেম, আমাদের বিপ্লব।
ঈদের সকালে নতুন পাঞ্জাবির গন্ধ মিশে যেতো ভেজা ঘাসের সঙ্গে।
নামাজ শেষে কোলাকুলি হতো।
কেউ সত্যি সুখী ছিল, কেউ শুধু সুখী থাকার অভিনয় করতো।
তখন বুঝতাম না।
এখন বুঝি, বড়দের হাসির ভেতরেও অনেক গোপন কান্না থাকে।
বিকেলে সেই ঈদগা মাঠেই শুরু হতো কাজীপাড়া বনাম উত্তর মৌড়াইলের ফুটবল যুদ্ধ।
একেকজন নিজেকে মনে করতো পেলে,ম্যারাডোনা, সালাহউদ্দিন,চুন্নু।
কারো পায়ে জুতা নেই, কারো শার্ট ছেঁড়া, কারো হাঁটু ফেটে রক্ত পড়ছে।
তবু খেলা বন্ধ নেই।
মাগরিবের আজান না পড়া পর্যন্ত পৃথিবীতে আমাদের আর কোনো দায়িত্ব ছিল না।
একবার বর্ষার পরে মাঠে হাঁটুসমান কাদা হয়েছিল।
সেদিনও খেলা হয়েছিল।
বল দেখা যাচ্ছিল না, মানুষ চেনা যাচ্ছিল না, শুধু কাদা উড়ছিলো আর হাসির শব্দ আকাশে উঠছিলো।
এখন মনে হয়, মানুষ সুখী হতে খুব বেশি কিছু চায় না।
একটা কাদামাখা বিকেলও মানুষকে সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
পুকুরটার ধারে একটা কদমগাছ ছিলো।
বর্ষাকালে তার ফুল ঝরে পড়তো পানিতে।
আমি অনেকদিন বিশ্বাস করতাম, ওই ফুলগুলো আসলে মৃত মানুষের চিঠি।
যারা চলে গেছে, তারা রাতের বেলায় পানির নিচ থেকে খবর পাঠায়।
পুকুরপাড়ের চায়ের দোকানটায় সন্ধ্যার পর বড় ভাইয়েরা রাজনীতি নিয়ে তর্ক করতো।
দেশ বদলানোর পরিকল্পনা হতো এক টাকার চায়ে।
আর এক কোণে বসে কোনো ব্যর্থ প্রেমিক উইলসকিংস সিগারেট ধরাতো।
প্রেমিকের চোখে এমন এক শূন্যতা ছিল, যেটা তখন বুঝিনি।
এখন মাঝরাতে আয়নায় নিজের চোখেও সেই একই শূন্যতা দেখি।
আমাদের পাশের বাড়ির সোলায়মান কাকা সারাজীবন সাইকেলের টায়ার মেরামত করেছেন।
তাঁর হাতের আঙুলে সবসময় কালো কালি লেগে থাকতো।
তিনি বলতেন,
“মানুষের জীবনও টায়ারের মতো রে বাবা,
একটু ফুটো হইলেই হাওয়া বাইর হইতে থাকে।”
তখন বুঝিনি।
এখন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কথাগুলো মরিচার মতো কানে বাজে।
তারপর একদিন শহর বদলাতে শুরু করলো।
পুকুরের চারপাশে টিনের বেড়া উঠলো।
লোকজন বললো, এখানে নাকি ডেভেলপমেন্ট হবে।
এই শব্দটা প্রথম শুনেছিলাম তখন।
ডেভেলপমেন্ট।
শব্দটার ভেতর কেমন যেন দাঁত বের করা হাসি ছিল।
কদমগাছ কাটা পড়লো।
পুকুর ভরাট হলো।
ঈদগা মাঠের একপাশে বিল্ডিং উঠলো।
যে ছেলেটা মাছ ধরতো, সে এখন রাইড শেয়ার চালায়।
যে মেয়েটা ছাদে উঠে চুল শুকাতো, সে এখন ফেসবুকে কসমেটিক্স বিক্রি করে।
যে বৃদ্ধ প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখতেন, তিনি একদিন নিঃশব্দে মারা গেলেন।
তাঁর মৃত্যুর খবরের চেয়েও বড় খবর ছিল, সেখানে কয়েকটি ছয়তলা বিল্ডিং উঠবে।
তরুলতা হাউজিং।
নামটা শুনলেই আমার কেমন হাসি পায়।
এখানে কোনো তরু -লতা কিছুই নেই।
এখানে শুধু পুরোনো পৃথিবীর লাশের উপর নতুন রঙ করা হয়েছে।
এখন সেখানে সুন্দর রাস্তা।
ব্যালকনিতে নীল আলো জ্বলে।
কফির দোকানে ভিড় হয়।
বাচ্চারা মাঠে না নেমে মোবাইলে ফুটবল খেলে।
ছাদের উপর ছোট ছোট বাগান হয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্য, এত সৌন্দর্যের ভেতরেও কোথাও মানুষের গন্ধ পাই না।
উত্তর মৌড়াইলের ছেলেরা এখন আর দক্ষিণ মৌড়াইলের কাউকে ঠিকমতো চেনে না।
রেললাইনটা এখনো আছে, কিন্তু তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো বদলে গেছে।
আগে ট্রেন গেলে সবাই হাত নেড়ে দিতো।
এখন কেউ কারো দিকে তাকানোরও সময় পায় না।
রাতে কখনো কখনো আমি সেই এলাকায় যাই।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি।
কেউ আমাকে চেনে না।
আমিও কাউকে চিনতে পারি না।
শুধু মনে হয়, এই ফ্ল্যাটগুলোর নিচে কোথাও এখনো ঘুমিয়ে আছে সেই পুরোনো পুকুর।
তার অন্ধকার জলের নিচে ডুবে আছে কদমফুল, শৈশব, মায়ের ডাক, বাবার দীর্ঘশ্বাস, আর কিছু অসমাপ্ত বিকেল।
তরু-লতা হাউজিংয়ের চকচকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে যারা রাতের শহর দেখে, তারা জানেও না, তাদের পায়ের নিচে একসময় ব্যাঙ ডাকতো।
জানেও না, এই মাটিতে এক কিশোর প্রথম প্রেমে পড়ে কেঁদেছিলো।
জানেও না, এক বিধবা নারী প্রতিদিন বিকেলে পুকুরে থালা ধুতে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলতেন।
কোনো কোনো রাতে এখনো খুব স্পষ্ট শুনতে পাই, দূরে কোথাও খেলার শব্দ হচ্ছে।
কেউ চিৎকার করে বলছে, “পাস দে! পাস দে!”
কেউ গোল মিস করে মাথায় হাত দিচ্ছে।
ঈদগা মাঠের বাতাসে এখনো হয়তো আমাদের ছেলেবেলা দৌড়ায়।
হয়তো এখনো কোনো অদৃশ্য বিকেলে, কদমগাছের নিচে আমরা বসে আছি।
কারো পায়ে জুতা নেই।
কারো পকেটে এক টাকাও নেই।
তবু নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ মনে হচ্ছে।
কারণ তখন আমাদের কাছে সময় ছিল।
মানুষ ছিল।
বন্ধুত্ব ছিল।
মাঠ ছিল।
আর ছিল এমন এক নিশ্চিন্ত জীবন, যেখানে ভবিষ্যৎ বলে কোনো ভয় ছিলো না।
আজ এত বছর পরে বুঝি, মানুষ আসলে জায়গা বদলায় না, জায়গাই মানুষকে বদলে দেয়।
পুকুর পাড় কাজীপাড়া থেকে তরুলতা হাউজিং পর্যন্ত আসতে আসতে আমরা সবাই একটু একটু করে অন্য কেউ হয়ে গেছি।
শুধু মাঝরাতে, খুব নির্জন কোনো সময়ে, হঠাৎ মনে হয় দূরে কোথাও কদমফুল ঝরে পড়ছে পানিতে।
দূরে একটা ট্রেন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।
রেললাইনের ওপারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো সে আমারই পুরোনো কোনো বন্ধু।
হয়তো সে ডাকছে—
“এই…
ট্রেন আসছে দেখবিনা "