বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল ও বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি এপ্রিল মাসের ২৬ ও ২৭ তারিখ-এই দুই দিনেই সারা দেশে বজ্রপাতে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে মোট ১,৮৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
২০২১ সালের পর থেকে মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বছরভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা হলো-২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ১৭৩ জন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ দ্রুত সৃষ্টি হচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া ব্যাপক হারে তালগাছ ও বড় গাছ কেটে ফেলা, খোলা মাঠে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আবহাওয়া সম্পর্কে জনগণের অজ্ঞতা এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা-এসব কারণে প্রাণহানি বাড়ছে।
দেশে বজ্রপাতে নিহতদের বড় অংশই কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, কারণ তারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, নির্মাণশ্রমিক, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, মোবাইল টাওয়ার বা উঁচু স্থানে কর্মরত ব্যক্তি এবং গবাদিপশু চরাতে যাওয়া মানুষ বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
বজ্রপাতের সময় করণীয়
জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক প্রাণহানি কমানো সম্ভব। বজ্রপাতের সময় নিম্নোক্ত নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি—
দ্রুত ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিন।
বৈদ্যুতিক সংযোগ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে দূরে থাকুন।
জানালা ও দরজা বন্ধ রাখুন।
গাড়ির ভেতরে থাকলে নিরাপদে অবস্থান করুন।
শিশুদের খোলা মাঠে খেলতে না দিন।
যা করা উচিত নয়
গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।
নদী, পুকুর বা জলাশয়ে থাকা বিপজ্জনক।
বজ্রপাতের সময় মোবাইল চার্জে ব্যবহার না করাই ভালো।
ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচেতনতা নয়; এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। যেমন—গ্রামাঞ্চলে বেশি করে তালগাছ রোপণ, বজ্রপাতের পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নত করা, স্কুল পর্যায়ে দুর্যোগ শিক্ষা চালু করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচার, মসজিদের ইমামের মাধ্যমে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সচেতনতামূলক আলোচনা, কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার অভিযান চালানো।
বজ্রপাতকে সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন।
বজ্রপাত এখন বাংলাদেশের একটি নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সময়মতো সতর্কতা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে বহু প্রাণ রক্ষা সম্ভব। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষায় সরকার ও জনগণসহ সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু সরকারের পক্ষে এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করা প্রায় অসম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী মো. নজরুল ইসলাম