সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ট্রাক ও পিকআপের সংঘর্ষে নিহত ৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে কী কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (৩ মে) সকাল ৬টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তেলিবাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, অন্যান্য দিনের মতো আজ ভোরে নগরীর আম্বরখানা এলাকা থেকে ২০ থেকে ২২ জন নির্মাণ শ্রমিক একটি পিকআপে করে লালাবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন। সেখানে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঢালাই কাজ করার কথা ছিল তাদের। পিকআপে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ধাতব মিক্সার মেশিনও ছিল তাদের সঙ্গে।
পিকআপটি দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় পৌঁছালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী কাঁঠালবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে সেটির সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৪ জন শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন নারীও ছিলেন। আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও ৩ জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। এতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ জনে।
নিহতরা হলেন- সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত ফখরুল আলীর ছেলে মো. সুরুজ আলী (৬০), একই উপজেলার সেঁততি গ্রামের বসির মিয়ার মেয়ে মোছা. মুন্নি (২৬), ভাটিপাড়া নুরনগর এলাকার মৃত নূর সালামের ছেলে ফরিদুল (৩৫), ধর্মপাশা উপজেলার সরিবা গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার স্ত্রী নার্গিস (৪৫), বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আজির উদ্দিন (৪০) ও আমিরউদ্দিন (৩৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা এলাকার সুরত আলীর ছেলে মো. বদরুল জামান (৪০) এবং একই উপজেলার শিবপুর গ্রামের কুটির বিশ্বাসের ছেলে পাণ্ডব বিশ্বাস (২০)।
এ ঘটনায় আরও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন- হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর (৩২), সিলেট নগরের কালিবাড়ি এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ (৬০), আম্বরখানার লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন (৪০) ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া (৪০), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার (২৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাউমারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম (৩০) এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া (৪৫)। এ ছাড়াও রহিম (৬০) নামের একজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় নুরজাহান হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় স্বামী বদরুল (৪০) নিহত হলেও একই গাড়িতে থাকা খাদিজা গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বদরুল-খাদিজা দম্পতির দুজনেই নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। সকালে নগরীর আম্বরখানা এলাকা থেকে এক বাড়ির মালিক তাদের ঢালাই কাজ করার জন্য নিয়ে যাওয়ার পথেই ঘটে যায় ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই খাদিজার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার; একদিকে নিজের আহত শরীর, অন্যদিকে স্বামীর নিথর দেহ। এ ঘটনায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল চত্বর।
খাদিজা ও বদরুলের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে ও এক কন্যা সন্তান। মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় হঠাৎই কেঁদে উঠছেন, আবার কখনো অপলক দৃষ্টিতে সন্তানদের দিয়ে তাকিয়ে থাকছেন এই নারী।
নিহত বদরুলের ছোটভাই আলাউর মিয়া বলেন, ভাই-ভাবি একসঙ্গে কাজ করতেন। আজকেও একসঙ্গেই কাজে গিয়েছিলেন। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বড় ভাই মারা গেছেন। শুনেছি, পিকআপে ঢালাইয়ের কাজ করার মেশিন ছিল। যখন ট্রাক উল্টে যায়, সেটি আমার ভাইয়ের ওপর পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার ঘরে চার সন্তান; এখন তাদের কী হবে, তাদের সংসার কীভাবে চলবে—দুশ্চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন আলাউর।
এদিকে চিকিৎসক কথা বলতে মানা করলেও ধীরে ধীরে খাদিজা বলেন, আজকে সকালে চা খেয়ে একসঙ্গে আমরা বের হয়েছিলাম, উনার পাশেই আমি বসে ছিলাম যখনই ট্রাকে আঘাত করল, তখনই উনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তারপর আর কিছু বলতে পারি না।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির বলেন, এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন মারা গিয়েছেন; ৪ জন দুর্ঘটনাস্থলে আর বাকি ৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এছাড়া যারা এই দুর্ঘটনায় আহত রয়েছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাটা আমরা আগে করছি। সবার আগে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, তারপর প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য যা করা প্রয়োজন, সবই করা হবে বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার পর ট্রাক ও পিকআপটি জব্দ করা হয়েছে। ট্রাকচালকের সহকারীকে আটক করা হয়েছে, তবে চালক পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিলেট ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, চালক ঘুমে আচ্ছন্ন থাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, নিহতরা সবাই নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
গত তিন বছরে প্রায় একই জায়গায় এ ধরনের দুটি দুর্ঘটনা ঘটল। এতে করে মোট ২১ জন শ্রমিকের প্রাণহানির তথ্যও সামনে এসেছে।
এর আগে, ২০২৩ সালে ৭ জুন ভোরে বর্তমান দুর্ঘটনাস্থলের অদূরে মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজারে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে ১৩ নির্মাণশ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় আহত ছিলেন আরও ১৩ জন। ওই ঘটনায় হতাহতরা সকলে ছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাই ভাটিপাড়ার বাসিন্দা।
দেশবার্তা/একে