গত এক সপ্তাহে উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পাগলা কুকুরের কামড়ের ঘটনায় কোমলমতি শিশুরা বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। অনেকেই স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বড়রাও কম আতঙ্কিত ছিলেন না। অনেকেই বাসাবাড়িতে নিরাপত্তার জন্য অবস্থান করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টের। তাই সাধারণ মানুষের দাবি, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে দেশের সকল হাসপাতালে সরকারি ভাবে জীবন রক্ষাকারী টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। যাতে কোনো মানুষ পাগলা কুকুরের হামলার শিকার হলে দ্রুত উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন।
মানুষের মনে পাগলা কুকুরের ভয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের এক উপজেলায় পাগলা কুকুরের কামড়ে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১১ জন। সর্বশেষ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের সুলতানা বেগম নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচজনে। মৃত্যুর মিছিল যেন লম্বা হচ্ছে। দীর্ঘ এক বছর ধরে হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নীরব ভূমিকা এলাকার সচেতন মহলকে হতাশ ও আহত করেছে।
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক এখনো একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুহার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। প্রতি বছর দেশে বহু মানুষ কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হন এবং অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা ও প্রতিষেধক টিকা না পাওয়ায় মৃত্যুর মুখে পতিত হন। অথচ সচেতনতা ও দ্রুত টিকা গ্রহণের মাধ্যমে জলাতঙ্ক শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। তাই দেশের সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিতভাবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধক টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বর্তমানে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি বেশি। গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে, আক্রান্ত প্রাণীর সামান্য আঁচড় বা কামড়ও মারাত্মক হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে টিকা নিতে জেলা শহর কিংবা বড় হাসপাতালে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি বাড়ে। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়িতে থেকে যান, যা পরে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই বাস্তবতায় দেশের প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত টিকা মজুত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে অনেক এলাকায় এখনো টিকার সংকট দেখা যায়। কোথাও টিকা না থাকায় রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে হয়। এই পরিস্থিতি জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা করা। তাই প্রতিটি উপজেলায় সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে জানাতে হবে—প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিতে হবে। কুসংস্কার কিংবা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি। ভবঘুরে কুকুর নিয়ন্ত্রণ, প্রাণীদের টিকাদান এবং জনগণকে সচেতন করার কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে দেশকে অনেকাংশে মুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
সর্বোপরি, মানুষের জীবন অমূল্য। একটি টিকার অভাবে যেন আর কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে। দেশের সকল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্ক প্রতিরোধক টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রয়োজনই নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী মো. নজরুল ইসলাম