গত ৩১ মে শেষ হয়েছে ‘এইচবিও’র আলোচিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’। এদিন প্রচারিত হয় সিরিজটির তৃতীয় তথা শেষ মৌসুমের শেষ পর্ব। এবারের কিস্তি মুক্তির পর আগেরগুলোর মতোই যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি নগ্নতা ও যৌনতার উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। বিশেষ করে সিডনি সুইনি অভিনীত ‘ক্যাসি’ চরিত্রটি নিয়ে।
অনেকের মতে, চরিত্রটিকে অতি যৌনতা–নির্ভর হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গসহ সিরিজটির নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী।
সিডনি সুইনির কাছে ক্যাসি শুধু আরেকটি সাধারণ চরিত্র নয়। ২০১৯ সালে যখন ‘ইউফোরিয়া’ শুরু হয়, তখন তিনি এত বড় ও জটিল কোনো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাননি। সেই অর্থে ক্যাসিই তাঁর অভিনয়জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সুইনি জানান, প্রতিটি মৌসুম শেষে তাঁদের কাছে নিশ্চিত খবর থাকত না যে সিরিজটির পরবর্তী মৌসুম আসবে কি না। ফলে প্রতিবারই তাঁর মনে হতো, হয়তো এটাই ক্যাসির সঙ্গে শেষ দেখা।
সিডনি সুইনির ভাষায়, ‘প্রথম মৌসুমের পর যেমন বিদায় বলেছি, দ্বিতীয় মৌসুমের পরও বলেছি। কারণ, প্রতিবারই আমরা চরিত্রটিকে জীবনের একেবারে নতুন জায়গায় ফিরে পেতাম। মাঝখানের সময়টুকু কল্পনায় পূরণ করতে হতো। এবার তৃতীয়বারের মতো বিদায় জানালাম। মনে হচ্ছে এবার সত্যিই শেষ।’
তবু সিডনি স্বীকার করেন, এখনো মাঝেমধ্যে তিনি ভাবেন ক্যাসি এরপর কী করত, কোথায় থাকত বা তার জীবনে আর কী ঘটতে পারত।
দ্বিতীয় মৌসুমের পর থেকে সিডনি সুইনির ক্যারিয়ারে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও শুরু করেছেন। ‘এনিওয়ান বাট ইউ’, ‘দ্য হাউসমেইড’, ‘রিয়েলিটি’সহ একের পর এক আলোচিত প্রকল্পে কাজ করেছেন। তবে এত সাফল্যের পরও ‘ইউফোরিয়া’ সেটে ফিরে যাওয়াকে তিনি নিজের ঘরে ফেরার সঙ্গেই তুলনা করেন।
সুইনি বলেন, ‘আমি এই সিরিজে বড় হয়েছি। এটিই ছিল প্রথম প্রকল্প, যেখানে মনে হয়েছিল- হ্যাঁ, ছোটবেলায় আমি যা হতে চেয়েছিলাম।
তৃতীয় মৌসুমের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি ছিল ‘অ্যাটাক অব দ্য ৫০ ফুট ওম্যান’ এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত একটি দৃশ্য। সেখানে বিশাল আকৃতির ক্যাসিকে দেখা যায় শহরের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে। অনেকে মনে করেছিলেন, পরিচালক স্যাম লেভিনসন হয়তো অকারণেই এমন দৃশ্য যোগ করেছেন।
কিন্তু সিডনি সুইনির মতে, এটি ছিল চরিত্রটির মানসিক অবস্থার নিখুঁত প্রতীক।
সিডনি সুইনি বলেন, ‘আমি দৃশ্যটি দারুণ উপভোগ করেছি। ক্যাসি সব সময় বড় বড় আবেগের মধ্যে বাস করে। সে ভালোবাসা চায়, স্বীকৃতি চায়, বিখ্যাত হতে চায়। সেই চাওয়ার মধ্যে সে নিজের চারপাশের সবকিছু ধ্বংস করতেও প্রস্তুত। দৃশ্যটি সেই মানসিক অবস্থারই রূপক।’
তৃতীয় মৌসুমে ক্যাসির জীবনের বড় ঘটনা ছিল নেটের সঙ্গে তার বিয়ে। দেখতে গেলে ক্যাসি যেন জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ করে ফেলেছে। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কটি ছিল গভীর সংকটপূর্ণ।
সিডনি মনে করেন, ক্যাসি আসলে কখনো ভালোবাসা কী, তা শেখেনি। ‘তার বাবার কাছ থেকে সে সুস্থ সম্পর্কের কোনো উদাহরণ পায়নি। স্কুলজীবনে ছেলেরা তাকে শুধু শরীর হিসেবে দেখেছে। ফলে সে নিজেকেও সেভাবেই দেখতে শিখেছে।
তাঁর মতে, ক্যাসি হয়তো নিজের মতো করে নেটকে ভালোবাসত, কিন্তু সেই ভালোবাসা ছিল ভ্রান্ত ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।
‘ইউফোরিয়া’র পর অনেকেই মনে করেছিলেন সিডনি সুইনি হয়তো সারা জীবন ক্যাসি ধরনের চরিত্রেই আটকে যাবেন। কিন্তু সিডনি সে ধারণার বিরোধিতা করে বলেন, ‘মানুষ বলে আমি টাইপকাস্ট হয়ে গেছি। অথচ ইউফোরিয়ার মাঝের সময়ে আমি একের পর এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্র করেছি।’
তাঁর মতে, অভিনয়ের আসল আনন্দ চ্যালেঞ্জে। তিনি এমন চরিত্র চান যা তাঁকে ভয় পাইয়ে দেয় এবং অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে যায়।
তবে ক্যাসির পরিণতি কি তাঁকে সন্তুষ্ট করেছে? এই প্রশ্নের উত্তরে সিডনি একমুহূর্তও দেরি না করে বলেন, ‘না। আমি কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারব না।’ তাঁর মতে, ক্যাসির গল্পে আরও অনেক কিছু বলার ছিল।
শেষ দৃশ্যে ক্যাসি নিজের বোন লেক্সির সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু লেক্সি চলে যাওয়ার পর নেটের সঙ্গে নিজের একটি ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখে জল চলে আসে।
সুইনির ব্যাখ্যা, ‘সে নিজের তৈরি পুতুলবাড়িতে বন্দী হয়ে গেছে। বাইরে থেকে মনে হয় সে সবকিছু পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সে আবার সেই একই জায়গায় ফিরে এসেছে, যেখান থেকে শুরু করেছিল।’
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ইউফোরিয়া’ ঘিরে যৌনায়নের বিতর্ক। সিরিজে ক্যাসিকে বারবার তার সৌন্দর্য ও শরীরের কারণে বিচার করা হয়েছে। কিন্তু সিডনি মনে করেন, বাস্তব জীবনেও মানুষ তাঁর সঙ্গে ঠিক একই কাজ করেছে।
সিডনি আরও বলেন, আমার কাছে বিষয়টা খুব অদ্ভুত লাগে। মানুষ ক্যাসিকে যৌন বস্তু হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করে, অথচ বাস্তবে তারাই আমাকে সেভাবে বিচার করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের শরীর, পোশাক বা নগ্ন দৃশ্য নিয়ে অবিরাম আলোচনা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তবে সিডনি সুইনি আশা করেন, কয়েক বছর পর যখন বর্তমান সময়ের বিতর্ক, ট্রলিং ও ক্লিকবেইট সংস্কৃতি মুছে যাবে, তখন মানুষ সম্পূর্ণ নতুন চোখে ‘ইউফোরিয়া’কে দেখবে।
তাঁর ভাষায়, ‘হয়তো একদিন কেউ পুরো বিষয়টি নতুন করে বিশ্লেষণ করবে এবং বলবে- আমরা হয়তো বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভুলভাবে দেখেছিলাম।’
দেশবার্তা/একে