আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের এক ছোট্ট বিন্দু। মানচিত্রে খুঁজতে গেলে হয়তো আতশকাচ লাগবে। কিন্তু সেই ছোট্ট বিন্দুটিই এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে এসেই তারা রুখে দিয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো ফুটবল পরাশক্তিদের। বিশ্ব গণমাধ্যম এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে এই দেশটির নাড়িনক্ষত্র। আর তাতেই বেরিয়ে আসছে এক অবিশ্বাস্য তথ্য—দেশটির নাগরিকদের মধ্যে যত মানুষ স্বদেশে বাস করেন, তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ থাকেন বিদেশে!
সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটির ফুটবল রূপকথা এবং এর পেছনে থাকা ১০ লাখ প্রবাসীর গল্প যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। ফুটবল থেকে শুরু করে সংস্কৃতি ও সমাজকাঠামো—সবখানেই দেশটি যেন প্রবাসীদের এক অনন্য মেলবন্ধন।
মানচিত্রের ক্ষুদ্র বিন্দু, বিশ্বমঞ্চে এক সিন্ধু
পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল উপকূল থেকে প্রায় ৩৫০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ। ১৪৫৬ সালের আগে এই দ্বীপে কোনো মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। পর্তুগিজ অভিযাত্রীদের হাত ধরে এখানে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে এটি দাস ব্যবসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বহু বছরের শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন পেরিয়ে ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করে কেপ ভার্দে। স্বাধীনতার পর থেকেই তীব্র খরা, পানির সংকট এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অভাবের কারণে এখানকার মানুষ দলে দলে পাড়ি জমায় ইউরোপ ও আমেরিকায়।
আজকের দিনে এসে দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মূল ভূখণ্ডে বর্তমানে বাস করেন মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দেয়ান প্রবাসীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি! অর্থাৎ, দেশের ভেতরের জনসংখ্যার চেয়ে প্রবাসীর সংখ্যা এখানে দ্বিগুণেরও বেশি।
ফুটবল বিপ্লব এবং ‘প্রজেক্ট লিংকডইন’
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘ব্লু শার্কস’ নামে খ্যাত কেপ ভার্দে জাতীয় ফুটবল দল যে পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে, তার মূল জ্বালানি জোগান দিচ্ছে এই প্রবাসীরাই। এত কম জনসংখ্যার দেশে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করা দুঃসাধ্য ছিল। তাই কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন (FCF) এক অভিনব কৌশল হাতে নেয়, যা ক্রীড়া বিশ্বে ‘প্রজেক্ট লিংকডইন’ নামে পরিচিত।
ফেডারেশনের স্কাউটরা এবং কোচ রুই আগুয়াস মাঠের স্কাউটিং ছেড়ে বসেন কম্পিউটারের সামনে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পেশাদার নেটওয়ার্কিং সাইট লিংকডইন (LinkedIn) ঘেঁটে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের একাডেমিতে থাকা কেপ ভার্দেয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের তালিকা তৈরি করতে শুরু করেন। ইউরোপে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা এসব প্রতিভাকে তারা পর্তুগাল বা ফ্রান্সের হয়ে খেলার স্বপ্ন বাদ দিয়ে নিজের শিকড়ে ফেরার আহ্বান জানান।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেস। আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারকে লিংকডইনে মেসেজ পাঠিয়েই জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিল কেপ ভার্দে ফেডারেশন। আজ সেই প্রবাসী ফুটবলারদের কাঁধে ভর করেই গ্রুপ ‘এইচ’-এ স্পেনকে ০-০ গোলে এবং উরুগুয়েকে ২-২ গোলে রুখে দিয়েছে তারা।
জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ জয় ও কৃত্রিম মাঠের বিপ্লব
পর্তুগিজ ভাষায় ‘কাবো ভের্দে’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘সবুজ অন্তরীপ’ হলেও বাস্তবে দেশটির জলবায়ু অত্যন্ত শুষ্ক এবং মরুভূমিময়। তীব্র পানি সংকটের কারণে দেশটিতে প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। ধুলাবালি আর শক্ত মাটিতে খেলে কখনো আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার হওয়া সম্ভব নয়, তা বুঝতে পেরেছিল দেশটির ফেডারেশন।
তারা ফিফার (FIFA Forward Programme) অনুদানের অর্থ শতভাগ সততার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে পুরো দেশজুড়ে ১৫টি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কৃত্রিম ঘাসের (Artificial Turf) পিচ বা মাঠ তৈরি করে। এই একটি সিদ্ধান্ত পুরো দেশের ফুটবল চিত্র বদলে দেয়। স্থানীয় কিশোররা সারা বছর আধুনিক ও দ্রুতগতির ফুটবলের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ পায়, যা আজ তাদের বিশ্বমঞ্চে লড়ার শক্তি জোগাচ্ছে।
ফুটন্ত আগ্নেয়গিরি আর ‘ডেড সি’র দেশ
কেবল ফুটবল বা প্রবাসী সংখ্যাই নয়, কেপ ভার্দের ভূপ্রকৃতিও অদ্ভুত সব বৈচিত্রে ভরা। দেশটির ‘সাল’ দ্বীপে একটি বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ভেতর রয়েছে ‘পেদ্রা দে লুমে’ নামক একটি লবণাক্ত হ্রদ। এই হ্রদের পানি সাধারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে ২৬ গুণ বেশি লবণাক্ত! জর্ডানের বিখ্যাত ‘মৃত সাগর’ বা ডেড সি-র মতোই এই হ্রদের পানিতে কোনো মানুষ না সাঁতার কেটেই অনায়াসে ভেসে থাকতে পারে।
আবার এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় ‘ফোগো’ দ্বীপে। সেখানে এখনো একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির ঠিক নিচের জ্বালামুখের উপত্যকায় মানুষ শুধু বসবাসই করে না, বরং সেখানকার খনিজসমৃদ্ধ আগ্নেয় মাটিতে চমৎকার স্বাদের আঙুর চাষ করে! সেই আঙুর থেকে তৈরি হয় বিশ্বমানের ফোগো ওয়াইন, যা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া লগারহেড প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপদের জন্য এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র।
অফিশিয়াল ভাষার চেয়ে ‘ক্রেওল’ প্রিয়
দেশটিতে ইউরোপীয় সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। কেপ ভার্দের অফিশিয়াল ভাষা পর্তুগিজ হলেও সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে পর্তুগিজ ও আফ্রিকান ভাষার মিশ্রণে তৈরি ‘ক্রেওল’ বা ‘ক্রিউলু’ (Kriolu) ভাষায় কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই ক্রেওল ভাষায় গাওয়া তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘মোর্না’ সঙ্গীত আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। খালি পায়ে গান গেয়ে বিশ্ব জয় করা কিংবদন্তি গায়িকা সিজারিয়া ইভোরা (Cesária Évora) ছিলেন এই দেশেরই সন্তান।
পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্ত স্বর্গ
আফ্রিকার অন্যান্য দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ নিত্যদিনের সঙ্গী, তখন কেপ ভার্দে সেখানে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে কেপ ভার্দেকে পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে উন্নত ও নিরাপদ জীবনযাত্রার দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশটির অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মোট শক্তির ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, কম জনসংখ্যা কিংবা খরা—কোনো কিছুই যে দমাতে পারে না, তার জীবন্ত প্রমাণ কেপ ভার্দে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ১০ লাখ প্রবাসীর রেমিট্যান্স আর হৃদয়ের টানকে পুঁজি করে সাড়ে পাঁচ লাখের এই দেশ এখন ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছে। মানচিত্রের ছোট্ট এই বিন্দুটি আজ সত্যিই এক বিশাল সিন্ধু হয়ে ডানা মেলেছে। সূত্র: আইওএম, ফরচুন, ফিফা
দেশবার্তা/একে