সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রতাপশালী সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত’র জনসভায় বোমা হামলা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় বাবর, আরিফ ও জিকে গৌছসহ ৮ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আলোচিত এই মামলায় জগন্নাথপুরের বাসিন্দা হাফেজ নাঈম আহমদ আরিফ ওরফে নিমুকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। সেই সঙ্গে আদালত তাকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। এদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় জামিন নিয়ে পলাতক থাকা মাওলানা তাজ উদ্দিনকে আদালত খালাস প্রদান করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) স্বপন কুমার সরকার এ চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন।
হত্যা চেষ্টা মামলার খালসপ্রাপ্তরা হলেন, বর্তমান সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপির সংসদ সদস্য জি কে গউছ, বিএনপি সরকারের সাবেক প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মুহিব উল্লা ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা, মো. আব্দুল মাজেদ বাট ওরফে ইউসুফ বাট, মো. নাজিউর রহমান নাজু ওরফে নাজমুল হক নাজু ওরফে নাজিমুল হক ও মাওলানা তাজ উদ্দিন (পলাতক)।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম হাফেজ সৈয়দ নাইম আহমদ আরিফ ওরফে নিমু। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর পশ্চিমপাড়া লম্বা হাটি (শাহারপাড়) গ্রামের মৃত মাওলানা আবুল কালামের ছেলে।
এছাড়া হাজতি আসামী মুহিব উল্লা ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা, মো: আব্দুল মাজেদ বাট ওরফে ইউসুফ বাটকে অন্যকোন মামলায় আটকাদেশ না থাকলে তাদেরকে অবমুক্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আসামীপক্ষের আইনজীবী বোরহান উদ্দিন বলেন, মামলায় মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়েছিলো। এর মধ্যে ৩ জনের আগেই অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বাকি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র আসামি হাফিজ সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ ওরফে নিমুর বিরুদ্ধে ৩টি ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়। পরে আদালত ৩০২ ধারায় তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।
আইনজীবী বোরহান উদ্দিন আরও বলেন, মামলার নয়জন আসামির মধ্যে পাঁচজন কারাগারে, তিনজন জামিনে ও একজন পলাতক। রায় ঘোষণার সময় পলাতক আসামি ছাড়া অন্য সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. আবুল হোসেন বলেন, মামলার রায়ে আজিজ নাইম নামে একজনকে মৃত্যুদন্ড ও ৯জনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। খালাস প্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক একজন রয়েছেন।
আদালত সূত্র জানায়, এর আগে এ বছরের এপ্রিল মাসে আলোচিত এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। সেই সঙ্গে গত ৭ এপ্রিল একই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে চান বিচারক। শুনানিতে অংশ নিয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে শ্রম, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও সংসদের সরকার দলীয় হুইপ জি কে গউছ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন তারা।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের নির্বাচনি এলাকা সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। সেদিন সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। গ্রেনেড বিস্ফোরণে যুবলীগের এক কর্মী ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং ২৯ জন আহত হন। হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই ঘটনায় দিরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।
এরপর ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটি মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গউছসহ ১০ জনকে আসামি করে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় ১২৩ জন সাক্ষী রয়েছেন। এর মধ্যে ৬৭টি জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এ মামলার রায় দেন বিজ্ঞ আদালত।
প্রতিনিধি/আরএইচ