কিলিয়ান এমবাপ্পের পায়ে ভাষা ফোটে ফুটবল মাঠে, ভীষণ ড্রিবলিংয়ে। তাঁর গোল করাতে থাকে শিল্পের ছোঁয়া। কারিকুরি, নিখুঁত পাসিংয়ে তিনি ফুটবলের পাবলো পিকাসো। ওই চিতার গতিতে ছুটে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইন ভেঙে দেওয়া, ব্যাক হিল বা ডাবল শ্যাডোয় ধোঁকা দিতে দেখা চোখের প্রশান্তি। তাঁর মতো একজনকে পেয়ে বর্তে গেছেন কোচ দিদিয়ের দেশম। শেষ ষোলোয় যাওয়ার ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করা এমবাপ্পেকে তাই টুপি খোলা অভিবাদন জানান তিনি। সুইডিশদের বিপক্ষে শেষ ৩২-এ ম্যাচটি দেখতে আসা ৮০ হাজার দর্শক বুঁদ হয়েছিলেন ফরাসি প্রদর্শনীতে। শ্বাসরুদ্ধকর একটি ম্যাচ হয়েছে বিশ্বের শহর খ্যাত নিউইয়র্কে, যে ম্যাচে ৩-০ গোলে জিতেছে ফ্রান্স।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফ্রান্স ভয়ংকর সুন্দর। গ্রুপ পর্ব থেকে যারা অপ্রতিরোধ্য। সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০, নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে। নকআউটেও জয়ের ব্যবধান তিন গোল, যা দেশমের দলের বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপে টানা পাঁচ ম্যাচে তিন বা ততোধিক গোল করার রেকর্ড কেবল ফ্রান্সের। সেই ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নকআউটের সুইডেন পর্যন্ত রেকর্ডের সময়কাল। এই দাপুটে ফ্রান্সকে নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই সমর্থকদের। মঙ্গলবার রাতের ম্যাচটি দেখার পর বিশেষজ্ঞরাও বিস্ময়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন– ‘ক্লাস অব ২০২৬’ ফ্রান্সকে কি কেউ থামাতে সক্ষম?
দেশম সংবাদ সম্মেলনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তাঁর দল নিয়ে। মায়ের মৃত্যুতে গ্রুপের শেষ ম্যাচে থাকতে না পারলেও উসমান দেম্বেলেরা হতাশ করেননি তাঁকে। নকআউটের চাপের ম্যাচেও শান্ত থেকে খেলে গেছেন মাইকেল ওলিসে, ব্রাডলি বারকোলা, উসমান দেম্বেলে, এনাগোলো কান্তে, মানু কনেরা। দেশমের এই দলের ২৬ জন খেলোয়াড়ই একেকজন তারকা। যারা খেলছেন এমবাপ্পের নেতৃত্বে। বিশ্বকাপ জিততে উন্মুখ হয়ে আছেন তারা। এমবাপ্পে তো প্রকাশ্যেই বলেছেন, মেসি আরও গোল করুক, আমার চাই বিশ্বকাপ ট্রফি। বিশ্বকাপে রেকর্ড ১৯ গোল আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসির। ১৮ গোল নিয়ে তাঁকে ছোঁয়া দূরত্বে ফরাসি মহাতারকা এমবাপ্পে। অথচ তাঁর চোখ ব্যক্তিগত রেকর্ডে নয়; শয়নে-স্বপনে চোখের সামনে ভাসে বিশ্বকাপের ট্রফি। তাই তো মেসির আর্জেন্টিনাকে আরেকবার ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়ার দাবি জানিয়ে রেখেছেন।
২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন এমবাপ্পের স্বপ্ন চুরি গেছে কাতারে। ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের যে ফাইনাল হবে, ওই ম্যাচের দৌড়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের ধার বাড়াচ্ছেন ফরাসিরা। দেশমের কাছে ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়, তাঁর দল শেষ পর্যন্ত যেতে পারবে কিনা। তিনি বলেন, একটু ধীরে চলুন ‘প্লিজ’। নিউইয়র্কের নিউ জার্সির যে মাঠে ফাইনাল হবে, তারই কি ফরাসি ড্রেস রিহার্সেল হলো মঙ্গলবার রাতে সুইডেনের বিপক্ষে। লা ব্লুজরা প্রতিপক্ষের রক্ষণে আক্রমণের ঢেউ তোলে ম্যাচের শুরু থেকে। কতগুলো নিশ্চিত গোল বঞ্চিত হয়েছে ফ্রান্স, ম্যাচ না দেখে থাকলে তা সংখ্যায় ফোটানো কঠিন। অফসাইডের অজুহাতে ২০ মিনিটে বাতিল হয় এমবাপ্পের গোল। এর কিছুক্ষণ পরে জুল কুদের নিচু ক্রস থেকে এমবাপ্পের জোরালো শট পোস্টে লাগে। ওলিসের ব্যাকভলি সাইড বারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি শট বাইরে মারেন দেম্বেলে। সুইডেন গোলরক্ষক জ্যাকব উইডেল জেটারস্ট্রমের একের পর এক দুর্দান্ত সেভ ফরাসিদের হতাশ করলেও প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে এমবাপ্পে ঐশ্বরিক কারিকুরি ও ধনুক-বাঁকা শটে গোল করে ছুটে যান কোচের কাছে। আপ্লুত দেশম শিষ্যকে বুকে টেন নেন ভালোবেসে।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর আট মিনিটের মাথায় ওলিসের পাস থেক বল জালে জড়ান ব্র্যাডলি বারকোলা। ৭৪ মিনিটে এমবাপ্পের নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ওলিসের চমৎকার পাস থেকে। শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে খেলবে ফ্রান্স। ওই ম্যাচ নিয়ে এমবাপ্পে বলেন, ‘আপাতত মাঝের এই সময়টায় পরিশ্রম করতে হবে। দেখতে হবে, প্যারাগুয়ে ম্যাচে কতটা উন্নতি করতে পারি। এখনও অনেক জায়গায় খামতি থেকে গিয়েছে। সেগুলো ঠিক করতে হবে। তবে দলের মানসিকতা ইতিবাচক। আমাদের গোল করার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে আমরা সব ম্যাচেই এগিয়ে যেতে পারি।’ কোচ দেশম ভীষণ খুশি দলীয় পারফরম্যান্সে, ‘এই দলটা ঐক্যবদ্ধ এবং আমি যখন এখানে ছিলাম না, তখনও তারা ভালো খেলেছে। একটি দলে সব সময়ই উন্নতির জায়গা থাকে। এই ম্যাচে ছন্দ পেতে ১৫ মিনিট লেগেছে। তার পর যা করার তাই করেছি। আমরা এখন শেষ ষোলোয়। সবারই উচিত উপভোগ করা।’ দেশমের এই আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে ফরাসি দলে। তাই খেলোয়াড়রাও নিজেদের উজাড় করে খেলেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। আরাধ্য বিশ্বকাপ শিরোপা পেতে আর মাত্র চারটি ম্যাচ জিততে হবে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের। এম/আর