বিশ্ববাজারে সোনার দামের রেকর্ড ভাঙার খেলা যেন থামছেই না। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। মাঝে কিছুটা ওঠানামা করলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা স্পষ্টতই ঊর্ধ্বমুখী।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালেও প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ ডলার; অথচ বর্তমানে তা ৪ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৫ বছরের মধ্যে সোনার দাম বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে আউন্সপ্রতি ৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতির কারণে যাতে টাকার মান কমে না যায়, সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীরা এখন সেই চেষ্টাই করছেন। সাধারণত ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়। তবে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার এখন তুলনামূলক কম। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদের সুরক্ষার জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজছেন। আর এক্ষেত্রে সোনা বা মূল্যবান ধাতুর বিকল্প নেই। চাহিদা বাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সোনার দাম বাড়ছে।
ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন ক্রমবর্ধমানভাবে সোনা কিনছে। চীন, রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কসহ উদীয়মান বাজারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সোনার মজুত রেকর্ড হারে বাড়াচ্ছে।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের মূল্যবান ধাতু বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল হুসেহ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো স্থায়ী ক্রেতারা এখন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। ফলে গহনা ক্রেতাদের মতো সাধারণ ক্রেতারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সোনার বাজার চাঙ্গা থাকার পেছনে এটিই ছিল মূল কারণ।
মাইকেল হুসেহ তার পূর্বাভাসে আরও জানান, স্নায়ুযুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আবার ফিরে আসছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মোট রিজার্ভের প্রায় ৪০ শতাংশ সোনায় রূপান্তর করতে পারে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে সোনার দাম আউন্সপ্রতি আট হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান দামের প্রায় দ্বিগুণ।
সোনার বাজারে এখন নতুন এক খেলোয়াড়ের আগমন ঘটেছে। এলবিবিডব্লিউর বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক শ্যালেনবার্গার জানান, সুদের হার কমার সম্ভাবনা, ডলারের দুর্বল অবস্থান এবং কয়েন বা বারের উচ্চ চাহিদার পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন সোনার বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তাদের বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে সোনা কিনছেন। ফলে সোনার বাজারে নতুন করে গতির সঞ্চার হয়েছে।
বিজেড ব্যাংকের গবেষণা বিশ্লেষক থমাস কুল্পের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তাই সোনার দাম বাড়ার প্রধান কারণ। বিশ্বজুড়ে সংকটের সময়ে সোনা সবসময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে।
তবে তিনি কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে জানান, বাজারে সোনার মৌলিক চাহিদা এখনো বেশ শক্তিশালী এবং আগামী ১২ মাসে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা দ্বিমতও রয়েছে। ফ্রাঙ্ক শ্যালেনবার্গার মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরে সোনার দাম দ্বিগুণ হওয়ার মতো বড় কোনো কারণ এই মুহূর্তে বাজারে নেই। সম্প্রতি সোনা কেনার গতি কিছুটা কমেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবুও বৈশ্বিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি ও যুদ্ধাবস্থার মধ্যে সোনার বাজারের এই জয়রথ যে আরও বেশ কিছুদিন বজায় থাকবে, সেই আভাসই দিচ্ছেন অধিকাংশ বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদরা। সূত্র: ডয়েচে ভেলে
দেশবার্তা/একে