বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের একজোট হওয়ার চেষ্টা। এই উদ্যোগ যদি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে থাকা কওমি দলগুলোর জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
জামায়াত জোটে থাকা কওমি ধারার দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার কথা স্বীকার করলেও এখনই জোট ছাড়ার বিষয়টি নাকচ করেছে। তবে জামায়াতের ধারণা, তাদের জোট ভাঙতে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকার ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশল।
গত নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা ইসলামি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার স্লোগান নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল একটি নির্বাচনী মোর্চা গঠন করে। পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এই মোর্চায় যোগ দিলে এটি ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়।
তবে নির্বাচনের ঠিক মাসখানেক আগে আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই জোট থেকে বেরিয়ে যায় চরমোনাই পিরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত কওমি ধারার দলগুলো মূলত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। যেখানে জামায়াত জোটে থেকে যায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুই অংশ ও নেজামে ইসলাম, আর জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে ভোটে লড়ে।
নির্বাচনের পর দেখা যায়, সংসদে বর্তমানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুজন এবং খেলাফত মজলিসের অন্য অংশের একজন সদস্য রয়েছেন, যারা এখনো জামায়াত জোটের অংশ। তবে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি- এমন একটি অস্বস্তি কওমি দলগুলোর মধ্যে কাজ করছে।
কওমি ঘরানার সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের পর থেকেই কওমি দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়াতে শুরু করেন বিএনপি নেতারা। অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে জামায়াতের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা নিয়েও কিছু কওমি দল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে কওমি ধারার দলগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার উদ্যোগ নেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার কওমি ঘরানার সাতটি দলকে নিয়ে বৈঠক করেন তিনি।
সভায় বিএনপি জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জামায়াত জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস ছাড়াও ইসলামি আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিরা যোগ দেন।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, হেফাজত আমির নির্বাচনের আগেই কওমি দলগুলোকে এক করার চেষ্টা করেছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তখন একেক দল একেক দিকে গেলেও, এখন সবাই নীতিগতভাবে একসাথে পথ চলতে সম্মত হয়েছে এবং আগামীতে তারা আবার বসবেন।
জামায়াত জোটে থাকলেও এখনই জোট ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ।
তিনি বলেন, বৈঠকটি ছিল নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর জন্য। নীতিগতভাবে একসাথে চলার সিদ্ধান্ত হলেও জোট ছাড়া বা না ছাড়ার বিষয়টি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই ঐক্যের পেছনে অন্য সমীকরণ দেখছেন। তিনি বলেন, এটি বিএনপি ও সরকারের ষড়যন্ত্র বলে তারা মনে করছেন। তবে জোটে যারা আছেন, তারা কেউ জোট ছাড়ার কথা বলেননি এবং কওমি দলগুলোর এই উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
জামায়াতের তোলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তবে কওমি দলগুলোকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা চলছে কি না- তার সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতিতে কৌশল ও নীতি বলতে একটা বিষয় আছে। বিএনপি যদি তার নীতি ও কৌশল দিয়ে অন্য কোনো দলকে কাছে টানতে পারে, তাহলে সমস্যা কোথায়? এখানে গোপন তো কিছু নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর কওমি দলগুলোর এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, কওমি ধারার দলগুলোর নিজেদের মধ্যে চিন্তার পার্থক্য অত্যন্ত তীব্র ও ব্যাপক। তারা এক হয়ে মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে চাইতেই পারে, কিন্তু বহুভাগে বিভক্ত এই দলগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা একমত হতে পারবে- সেই প্রশ্ন থেকে যায়। এটি কারও ইন্ধনে হচ্ছে কি না, তা পরিষ্কার হতেও কিছুটা সময় লাগবে।
দেশবার্তা/একে