ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার | ২১ জুলাই ২০২৬ | ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ২০:১৩
চলমান বার্তা:
যশোরে ‘সবুজ সোনা’ শ্বেতচন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব
উবাঈদুল হুসাইন আল্-সামি, যশোর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১৫:২৯  (ভিজিটর : )

যশোরের চলতি বৃক্ষমেলায় সারি সারি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের ভিড়ে দর্শনার্থীদের বিশেষ নজর কেড়েছে একটি ছোট্ট চারা। দেখতে সাধারণ হলেও এর দাম কয়েক হাজার টাকা। কারণ এটি সাধারণ কোনো গাছ নয়—বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের অর্থকরী ও ঔষধি বৃক্ষ শ্বেতচন্দন (Santalum album), যা ‘সবুজ সোনা’ নামেই বেশি পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে প্রায় চার লাখ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে সুগন্ধি, ঔষধি ও উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্যের গাছের সংখ্যা খুবই সীমিত। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে শ্বেতচন্দন। এটি একটি আধা-পরজীবী উদ্ভিদ, যা নিজের শিকড়ের পাশাপাশি আশপাশের গাছের শিকড় থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর পর এর কাণ্ড ও শিকড়ে মূল্যবান সুগন্ধি তেল তৈরি হয় এবং তখনই বাণিজ্যিকভাবে সংগ্রহের উপযোগী হয়।

চন্দনের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও চিকিৎসাক্ষেত্রেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। হিন্দুধর্মে পূজা-পার্বণ, তিলক, ধূপ ও আগরবাতি তৈরিতে চন্দনের ব্যবহার সুপ্রাচীন। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও এর ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, মুসলিম ঐতিহ্যে প্রাকৃতিক আতর ও সুগন্ধি তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে চন্দনের নির্যাস।

আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় চন্দন চর্মরোগ, জ্বর, মাথাব্যথা এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক প্রসাধনী শিল্পেও চন্দন তেলের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বাজারভেদে খাঁটি চন্দন তেলের মূল্য প্রতি কেজিতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের জলবায়ু চন্দন চাষের জন্য অনুকূল হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, কারিগরি জ্ঞান এবং নীতিগত সহায়তার অভাবে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ এখনো সীমিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।

যশোরের চন্দন চাষি ও নার্সারি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন গত ১৬ বছর ধরে শ্বেতচন্দন নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, মানুষ সাধারণত ফল বা ফুলের গাছ খোঁজে, কিন্তু আমি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখেই চন্দন চাষ শুরু করেছি। সঠিক পরিচর্যা করলে একটি গাছ ২০ বছর পর ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্য পেতে পারে। সরকার কারিগরি সহায়তা ও প্রণোদনা দিলে যশোর দেশের অন্যতম চন্দন উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

তিনি জানান, বন বিভাগের কাছ থেকে একটি চারা সংগ্রহ করে গবেষণামূলকভাবে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তার নার্সারিতে দুই থেকে তিন বছর বয়সী প্রায় চার হাজার চারা এবং ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী কয়েক শতাধিক গাছ রয়েছে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে চারা উৎপাদনেও তিনি সফল হয়েছেন।

বৃক্ষমেলায় চন্দনের চারা কিনতে আসা যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ বৈরাগী বলেন, চন্দন শুধু একটি গাছ নয়, এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। মাত্র ৫০ টাকায় ৪৪ দিনের চারাটি কিনেছি। ভবিষ্যতে ধর্মীয় প্রয়োজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল্যও পাব।

আরেক দর্শনার্থী অর্ণিমা বলেন, ছোটবেলায় ঠাকুমাকে পূজায় চন্দন বাটতে দেখেছি। সেই স্মৃতি থেকেই একটি চারা কিনেছি। আশা করছি, একদিন নিজের গাছের চন্দন ব্যবহার করতে পারব।

যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. আইয়ূব হোসেন বলেন, চন্দন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অর্থকরী বৃক্ষ। এটি খরা সহনশীল এবং অনুর্বর জমিতেও জন্মায়। তবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চন্দনের জেনেটিক সম্পদ সংরক্ষণ ও গবেষণা বাড়ানো জরুরি।

তিনি আরও বলেন, চন্দনের ধর্মীয় ও ঔষধি গুরুত্ব অপরিসীম। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, প্রাকৃতিক চিকিৎসা এবং সুগন্ধি শিল্পে এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দনের বিশ্ববাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে দীর্ঘ উৎপাদনকাল, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নীতিগত সহায়তার অভাব এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি চন্দনকে উচ্চমূল্যের ঔষধি ও অর্থকরী বৃক্ষ হিসেবে বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনে, সহজ ঋণ ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।

উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, পরিকল্পিত উদ্যোগ, গবেষণা ও সরকারি সহযোগিতা পেলে শ্বেতচন্দন একদিন বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য অর্থকরী বৃক্ষে পরিণত হবে—আর যশোর হয়ে উঠবে দেশের ‘সবুজ সোনা’র রাজধানী।

দেশবার্তা/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।