সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে টিএসসি চত্বরে শোনা যায় একদল তরুণ শিক্ষার্থীর শাণিত বাকযুদ্ধ। কেউ হয়তো সাবলীল ভঙ্গিতে খণ্ডন করছেন প্রতিপক্ষের যুক্তি, কেউবা শান্ত কণ্ঠে বুনে যাচ্ছেন নিজস্ব দর্শনের জাল। এই তরুণেরাই হলেন জাবির কেন্দ্রীয় বিতর্ক সংগঠন 'জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেট অর্গানাইজেশন'-এর প্রাণ, যা ক্যাম্পাসে 'জেইউডিও' (JUDO) নামেই সমধিক পরিচিত।
যেভাবে শুরু পথচলা
"Let be lightened" বা "আলোকিত হোক"—এই অমোঘ স্লোগানকে ধারণ করে ২০০৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে জেইউডিও। মাত্র ৭ জন স্বপ্নদর্শী বিতার্কিকের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি আজ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ বিতর্ক সংগঠন। জেইউডিও-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুল্লাহ আহমেদ চৌধুরী (মামুন) এবং প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাজহারুল ইসলাম (রাজন)। শুরুর সেই ছোট্ট পরিসর পেরিয়ে বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক নিয়মিত সদস্য নিয়ে জেইউডিও ক্যাম্পাসে যুক্তির মশাল জ্বেলে রেখেছে।
যুক্তির অন্তর্নিহিত বিশ্লেষণ: জেইউডিওর দর্শন
জেইউডিওর বিতর্ক কার্যক্রম কেবল নিছক তর্ক বা ট্রফি জয়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত সমাজ পরিবর্তনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। বর্তমান সময়ে যখন ফেক নিউজ, প্রোপাগান্ডা এবং একপাক্ষিক মতাদর্শে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তখন জেইউডিও শেখায় কীভাবে যেকোনো তথ্যকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হয়।
প্রতিটি আয়োজনে তাদের নির্বাচিত থিম বা স্লোগানগুলো এর বড় প্রমাণ। যেমন— "তফাৎ হোক শিরদাঁড়ায়", "মগজচাষেই মাদকনাশ", কিংবা "শব্দ হোক প্রতিরোধের পতাকা"। এই স্লোগানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেইউডিও শুধু হার-জিতের জন্য বিতর্ক করে না; বরং তারা সমাজের অসংগতি, অন্যায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের মননে প্রতিরোধের বীজ বপন করতে চায়।
সাম্প্রতিক অর্জন ও জাতীয় অঙ্গনে দাপট
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জেইউডিও-এর বিতার্কিকরা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। অতি সম্প্রতি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাবির সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসব উদযাপনের মধ্য দিয়ে তারা তাদের সাংগঠনিক শক্তির নতুন জানান দিয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও সফলভাবে শেষ করেছে জেইউডিও আয়োজিত সুবিশাল 'জাতীয় বিতর্ক উৎসব', যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক দল অংশ নেয়।
জাবির বিভিন্ন বিভাগ ও হলের বিতর্ক কার্যক্রমও জেইউডিও-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। নবীন বিতার্কিকদের জন্য নিয়মিত 'নবীনবরণ ও বিতর্ক কর্মশালা' এবং 'জেইউডিও এমিনেন্স' (JUDO Eminence) এর মতো আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল টুর্নামেন্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা প্রতিনিয়ত বিতর্কের মানদণ্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
নেতৃত্বের ভাবনা: আগামীর জেইউডিও
গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জেইউডিও-এর ২০২৬ সেশনের জন্য নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়েছে, যেখানে সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন ইতিহাস বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আল লুবান এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাজুন ইসলাম।
সংগঠনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বর্তমান সভাপতি মো. আল লুবান বলেন, "জেইউডিও শুধুমাত্র ভালো বিতার্কিক তৈরি করে না, বরং একজন যুক্তিবাদী ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সচেতন নাগরিক তৈরি করতে কাজ করে। আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য হলো, বিতর্ক চর্চাকে শুধুমাত্র ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা চাই আমাদের বিতার্কিকরা জাতীয় পলিসি মেকিং এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে আরও জোরালো ভূমিকা রাখুক।"
শিক্ষকের চোখে জেইউডিও: শিক্ষার্থীর সার্বিক কল্যাণে যুক্তির ভূমিকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে জেইউডিওর ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শ কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন রুনু বলেন:
"বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়, বরং মুক্তবুদ্ধি ও মননশীলতা চর্চার এক মহতী চারণভূমি। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেট অর্গানাইজেশন (জেইউডিও) দীর্ঘ দুই দশক ধরে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই মননশীলতার চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "একজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী কল্যাণের দায়িত্বশীল হিসেবে আমি মনে করি, বিতর্ক কেবল বাকপটুতা নয়, বরং এটি অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হওয়ার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। জেইউডিও-এর বিতার্কিকরা যেভাবে যুক্তির মাধ্যমে অন্ধকারের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করছে, তা আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক পরিপক্কতা এবং বিশ্বমানের নেতৃত্ব গুণাবলী অর্জনে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে।"
আগামীর প্রত্যাশা
জেইউডিও বিশ্বাস করে, একটি যুক্তিবাদী, সচেতন ও সোচ্চার তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই সমাজ থেকে সব অসংগতি দূর করা সম্ভব। তোতাপাখির মতো মুখস্থ বিদ্যার যুগে জেইউডিও-এর বিতার্কিকরা প্রশ্ন করতে শেখেন, সত্যের অনুসন্ধান করতে শেখেন। জাবির এই লাল মাটির ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া তাদের এই যুক্তির লড়াই ছড়িয়ে পড়ুক ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি কোণায়—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
প্রতিনিধি/আরএইচ