যশোর শহরের পরিচিত খাবারের দোকান ‘ক্যাফে নূর’। বাইরে থেকে চাকচিক্য থাকলেও রান্নার ভেতরের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। নোংরা পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ পচা মাংস আর নিষিদ্ধ রাসায়নিক দিয়ে তৈরি খাবার পরিবেশন করে গ্রাহকদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে রীতিমতো ছিনিমিনি খেলছিল প্রতিষ্ঠানটি। অবশেষে এক ভয়াবহ বিষক্রিয়ার ঘটনার সূত্র ধরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে বেরিয়ে এলো ক্যাফে নূরের আসল রূপ।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার রাতে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাফে নূর থেকে ২৫ প্যাকেট বিরিয়ানি অর্ডার করা হয়েছিল। সেই খাবার খাওয়ার পরপরই সংগঠনের আটজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা একে ‘ফুড পয়জনিং’ বা খাদ্য বিষক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ঘটনার রেশ ধরেই নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন।
অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামানের নেতৃত্বে ক্যাফে নূরে এক ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় হোটেলের রান্নাঘরে ঢুকে রীতিমতো আঁতকে ওঠেন কর্মকর্তারা। দেখা যায়, ফ্রিজে মজুত করা রয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত পচা মাংস। আগে থেকে তৈরি করে রাখা বাসি রুটি ও পরোটার খামিরের ওপর তেলাপোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়া বারবার ব্যবহারের ফলে কালো হয়ে যাওয়া পোড়া তেল দিয়ে ভাজা হচ্ছিল খাবার।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় ছিল রান্নাঘর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৩২ পিস ‘মোগলাই সেন্ট’ নামক রহস্যময় নিষিদ্ধ কেমিক্যাল এবং চার বোতল কেওড়া জল। এসব পণ্যের গায়ে উৎপাদনের কোনো তারিখ, মেয়াদ কিংবা বিএসটিআইয়ের কোনো অনুমোদন ছিল না। এমনকি রান্নার কারিগরদের স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই ছিল না; হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থাও মেলেনি সেখানে।
অভিযান শেষে জব্দকৃত পচা মাংস, বাসি খাবার ও নিষিদ্ধ রাসায়নিক জনসম্মুখেই ধ্বংস করা হয়। এ সময় ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ণ করা এবং জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলার অপরাধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের তিনটি ধারায় ক্যাফে নূর হোটেল কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, জনস্বার্থ রক্ষায় তাঁদের এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হলে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালাসহ আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো রমজান মাস এবং তার পরবর্তী সময়েও যশোরের অন্যান্য হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে এই তদারকি কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে তিনি জানান।
অভিযান চলাকালে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর প্রতিনিধি এবং যশোর জেলা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শহরবাসীর দাবি, শুধু জরিমানা নয়, নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে যেন খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়।
প্রতিনিধি/একে