মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে কঠিন আঘাত হানবে আর তারা যুদ্ধের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকালে টেলিভিশনে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ৩২ দিন ধরে চলা আক্রমণে তার সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, চূড়ান্ত ও অপ্রতিরোধ্য বিজয়’ নিয়ে এসেছে আর ইরান আর কোনো নিরাপত্তা হুমকি হয়ে নেই।
তিনি বলেন, “আজ রাতে আমি বলতে পারি, শিগগিরই, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আমেরিকার সব সামরিক উদ্দেশ্য পূরণ করার পথে রয়েছি। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠিন আঘাত হানতে যাচ্ছি। তারা যার অংশ তাদের সেই প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠাচ্ছি আমরা।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আঘাত হানলে ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। কয়েকদিনের মধ্যেই লেবাননেও এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এ যুদ্ধে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
আক্রান্ত হওয়ার পর ইরান বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল-গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। ফলে আর্থিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে আর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী কংগ্রেসীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ট্রাম্পের ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থনের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালির প্রয়োজন নেই আর যুক্তরাষ্ট্রে যে মিত্ররা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের ওপর নির্ভরশীল তাদের প্রণালিটি ফের উন্মুক্ত করতে কাজ করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দামের সাম্প্রতিক বৃদ্ধিতে অনেক আমেরিকানই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। স্বল্প সময়ের এই বৃদ্ধি পুরোপুরিই প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক তেল ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর ইরানি শাসকদের বিপজ্জনক সন্ত্রাসী হামলার ফলাফল, যে দেশগুলোর এই সংঘাতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।”
ট্রাম্পের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের একেবারে দোরগোড়ায় ছিল। তবে এ দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি আরও বলেন, “গত চার সপ্তাহে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, চূড়ান্ত ও অপ্রতিরোধ্য বিজয় নিয়ে এসেছে। আমরা ওই শাসকদের আমেরিকাকে হুমকি দেওয়ার বা তাদের সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের সামথ্র্যকে পদ্ধতিগতভাবে গুড়িয়ে দিচ্ছি।”
ট্রাম্পের ভাষণের পর শেয়ার বাজার পড়ে যায় আর তেলের মূল্য হঠাৎ করে বেড়ে যায়। ভাষণে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পরিষ্কার পথ বিস্তারিতভাবে তুলে না ধরায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধটি ‘ব্যাপক, বৈশ্বিক ও অত্যন্ত অপ্রতিসম’ প্রভাব ফেলছে। সংস্থাগুলো আরও বলেছে, তারা তাদের তৎপরতা সমন্বয় করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
এদিকে, জাতির উদ্দেশে ট্রাম্পের বক্তব্য শেষ হতেই ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।
আল জাজিরা জানায়, ট্রাম্পের ভাষণ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন করে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। এ সময় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার কথা জানায় এবং হুমকি মোকাবিলায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
ইরান প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চল। ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর তেল আবিব, শেফেলা ও আশপাশের এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলেও জানা গেছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র বা তার ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানতে পারে। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এছাড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রে ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যা আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়।
দেশবার্তা/এসবি