দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সরকারি কলেজে এক ব্যতিক্রমী ও হৃদয়স্পর্শী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সোমবার (৬ এপ্রিল) অবসরজনিত বিদায় জানানো হয়েছে অধ্যক্ষ প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরকে। সকাল সাড়ে ১১টায় কলেজ চত্বরে আয়োজিত অধ্যক্ষের বিদায় সংবর্ধনা মুহূর্তেই পরিণত হয় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত স্মৃতির এক আবেগঘন পরিবেশের।
ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান হাবীব। শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মো. সাইফুদ্দীন এমরানের সঞ্চালনায় আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর উপস্থিতিতে প্রিয় অধ্যক্ষকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠান শেষে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য কলেজের সকল বিভাগের উদ্যোগে অবসরে যাওয়া অধ্যক্ষ প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বিদায় জানানো হয়। ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ চত্বর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাঁকে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পূর্ব জগন্নাথপুর গ্রামে তার নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফুলবাড়ীতে এ ধরনের আয়োজন এই প্রথম, যা উপস্থিত সকলের হৃদয়ে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
১৯৬৭ সালে জন্মগ্রহণকারী প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরের কর্মজীবন প্রায় ২৯ বছরের। এই কলেজেরই শিক্ষার্থী হিসেবে তার পথচলা শুরু। পরবর্তীতে তিনি এই কলেজেই দীর্ঘ ১৮ বছর শিক্ষকতা করেন এবং সবশেষে প্রায় এক বছর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়। ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি ছিলেন সকলের কাছে শ্রদ্ধেয়। বিশেষ করে গরিব ও অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিদায় বক্তব্যে আবেগ আপ্লুতত হয়ে প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীর বলেন, “এই কলেজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এখানে আমি শিখেছি, বেড়ে উঠেছি এবং সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। আমি সবসময় ন্যায়ের পথে থাকার চেষ্টা করেছি। তোমাদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড়প্রাপ্তি।”
সহকর্মী শিক্ষকরা বলেন, তিনি শুধু একজন প্রশাসকই ছিলেন না, ছিলেন একজন অভিভাবক। নীতির প্রশ্নে আপসহীন এবং মানবিকতায় অনন্য এই মানুষটির বিদায়ে কলেজ পরিবার এক আদর্শ ব্যক্তিত্বকে হারালো।
শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যক্ষ তাদের কাছে শুধুমাত্র একজন শিক্ষক নন, বরং একজন অভিভাবক ছিলেন। যেকোনো সমস্যায় তার কাছে গেলে কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়নি। তার বিদায়ে তারা গভীর শূন্যতা অনুভব করছেন।
অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, “স্যার সবসময় ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ছিলেন এক ভরসার জায়গা। তার মতো মানুষ আমাদের জীবনে খুব কমই আসে। আমরা তাকে খুব মিস করবো।”
কর্মচারীরাও জানান, তিনি সবসময় তাঁদের সম্মান দিয়েছেন, কথা শুনেছেন এবং প্রয়োজনে সহায়তা করেছেন। অনেক অসহায় মানুষ তার কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে উপকৃত হয়েছেন। এমন মানবিক মানুষ সত্যিই বিরল।
বিদায়ী সংবর্ধনা উপলক্ষে শিক্ষক পরিষদের আয়োজনে একটি আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় এবং সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করেন গভীর আবেগে।
ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের চত্বরে হয়তো আর প্রতিদিন দেখা যাবে না প্রিয় সেই মুখটি, তবে তার সততা, মানবিকতা ও ভালোবাসার স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে।
প্রতিনিধি/আরএইচ