ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার | ৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২৪ চৈত্র ১৪৩২ 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793693_Self-1.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793710_Self-2.jpg

সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:৫৭
চলমান বার্তা:
হরমুজেই আটকে যুদ্ধ!
শাহিদুল ইসলাম সায়ান
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:৩০  (ভিজিটর : )

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান নাট্যমঞ্চ এখন এক সরু অথচ ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ জলপথ- হরমুজ প্রণালী। মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সমুদ্রপথটি আজ বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগকারী এই পথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল ও তরল গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই কারণে হরমুজ শুধু একটি জলপথ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির “লাইফলাইন”। আর সেই লাইফলাইন এখন কার্যত ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরান এই প্রণালীকে ব্যবহার করছে একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। সামরিকভাবে সরাসরি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি না হয়ে তারা এখন “চোকপয়েন্ট কূটনীতি” চালু করেছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ না করে বিশ্বের অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার সক্ষমতাই এখন তেহরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান জানে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তারা এমন একটি কৌশল নিয়েছে যেখানে যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপই প্রধান অস্ত্র। এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালী কার্যত এক “গ্লোবাল ব্ল্যাকমেইল পয়েন্ট”-এ পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন এই পথে চলাচল নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই অস্থির হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে ব্যারেলপ্রতি দাম ২০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে- এমন আশঙ্কাও করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইরানের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট, কোনো “সাময়িক যুদ্ধবিরতি” নয়, বরং স্থায়ী নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া তারা হরমুজ প্রণালী খুলবে না। তেহরানের দাবি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকি অব্যাহত থাকলে এই জলপথ তাদের জন্য প্রতিরক্ষার শেষ লাইন। 

ইরানের সামরিক কৌশলগত বিশ্লেষকরা মনে করেন, হরমুজ নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য তিনটি প্রধান সুবিধা তৈরি করেছে: প্রথমত, এটি আন্তর্জাতিক দরকষাকষির শক্তি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখনই চাপ বাড়ায়, ইরান হরমুজ বন্ধের ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি একটি প্রতিরোধমূলক অস্ত্র। বিদেশি নৌবাহিনীর উপস্থিতি ইরান সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে। তৃতীয়ত, এটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। ইয়েমেনের হুথি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় এই কৌশল সহায়ক।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছে। মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যেই একটি আল্টিমেটাম দিয়েছে- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হলে সেটি দ্রুত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং পরে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইসরায়েল এই সংকটে আরও চাপে রয়েছে। একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েই কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকছে, যদিও প্রকাশ্যে তারা কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।

বর্তমান সংকটে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশর সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তাদের প্রস্তাবিত “ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড” এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এই প্রস্তাব অনুযায়ী দুই ধাপে সমাধান পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে: প্রথম ধাপে ৪৫ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি, দ্বিতীয় ধাপে স্থায়ী শান্তিচুক্তির কাঠামো, কিন্তু ইরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট- যেকোনো যুদ্ধবিরতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভিত্তিতে। ইরানের দাবি, অতীতে একাধিক “সাময়িক চুক্তি” পরে ভেঙে গেছে। তাই তারা এখন আর অস্থায়ী সমাধানে আগ্রহী নয়। 

অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা করছে একটি “ইলেকট্রনিক সমঝোতা কাঠামো” তৈরি করতে, যেখানে প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আস্থার সংকট এখন সবচেয়ে বড় বাধা। এই আলোচনার মধ্যেই আবারও সংঘর্ষের খবর এসেছে। ইরানের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এই যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, বরং এটি একটি “বিশ্বাসের যুদ্ধ”- যেখানে কোনো পক্ষই আর অপর পক্ষকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। তেলের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। ইউরোপে ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। 

চীন ও ভারত, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বড় আমদানিকারক, তারা বিকল্প রুট ও সরবরাহ উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ডলার সংকট আরও গভীর হতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যের দামে। ইতোমধ্যেই দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্কের দিকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ আলোচনা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট চললে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।

বিশ্ব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই- এই সংঘাত কি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি নতুন একটি বৈশ্বিক সংঘাতের সূচনা? হরমুজ প্রণালী এখন কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইরান যদি এই পথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি এখনো “উচ্চ ঝুঁকির অনিশ্চয়তা” পর্যায়ে রয়েছে। কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা এই সংকটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। 

বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এক সরু জলপথের দিকে- যেখানে হয়তো নির্ধারিত হবে আগামী দশকের বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।

হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধু একটি ভূগোল নয়- এটি একটি বৈশ্বিক শক্তির পরীক্ষাগার। এখানে দাঁড়িয়ে আছে তেল, ক্ষমতা, কূটনীতি এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। ‘যুদ্ধ কি থেমে যাবে হরমুজে, নাকি এখান থেকেই শুরু হবে নতুন বিশ্বযুদ্ধ?’, এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

দেশবার্তা/এসআইএস/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
নির্বাচিত সংবাদ
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর, দিল্লির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জোর দেবে ঢাকা
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর, দিল্লির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জোর দেবে ঢাকা
হামের টিকা সংকট, বিগত দুই সরকারকে দায়ী করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
হামের টিকা সংকট, বিগত দুই সরকারকে দায়ী করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
তনু হত্যার ১০ বছর পর তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ
তনু হত্যার ১০ বছর পর তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ
স্বত্ব © ২০২৫ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793725_Self-3.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793740_Self-4.jpg