ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793693_Self-1.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793710_Self-2.jpg

সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৮:৪২
চলমান বার্তা:
ফ্যামিলি কার্ড বদলে দিচ্ছে প্রান্তিক নারীর জীবন, স্বস্তি আসছে সংসারে
বাসস
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৪৩ আপডেট: ২৭.০৪.২০২৬ ১৫:৩৩  (ভিজিটর : )

‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় বদলে যাচ্ছে শত শত দরিদ্র নারীর জীবন। এই কর্মসূচি নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে নারীদের জীবনে। নিজস্ব আয়ের পথ তৈরি হওয়ায় স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন প্রান্তিক জনপদের এসব নারীরা।

এ বিষয়ে রাজধানীর কড়াইল বস্তির সাবিনা আক্তার বেশ উৎফুল্ল হয়ে কথাগুলো বলছিলেন, রিকশার জমা, খাওয়া-পরা, পোলাপানের পড়া-লেখা—সব মিটাইয়া শেষে ঘরভাড়া দিতেই কষ্ট হইত। এখন অন্তত সময়মতো ঘরভাড়াটা দিতে পারি, এইটাই বড় কথা।  

সাবিনা আক্তার পেশায় গৃহকর্মী। স্বামী মো. সাইদুর রহমান ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। তিন সন্তানের সংসার। আগে মাস শেষে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল ঘরভাড়া। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাওয়ার পর সেই চাপ কিছুটা কমেছে বলে জানান তিনি।

শুধু সাবিনাই নন, তার মতো আরও অনেকের কাছেই এই সহায়তা প্রথমবারের মতো কোনো সরকারি সুবিধা প্রাপ্তি। উপকারভোগীদের অনেকেই জানান, পরিমাণে অল্প হলেও এই সুবিধা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঢাকার কড়াইল বস্তি— অভিজাত গুলশান-বনানীর পাশেই গড়ে ওঠা এক ভিন্ন বাস্তবতা। একদিকে কাঁচের দেয়ালঘেরা অট্টালিকা, অন্যদিকে টিনের ছাউনি আর বাঁশের বেড়ার খুপড়ি ঘর। এই বৈপরীত্যের মাঝখানেই বাস করেন হাজারো প্রান্তিক মানুষ, যাদের প্রতিদিনের জীবন মানেই টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই।

গত ১৬ এপ্রিল সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই জনপদে নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। যাদের সঙ্গে কথ হয়েছে, তারা সবাই এই কার্ডের সুবিধাভোগী। মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা—সংখ্যায় ছোট হলেও কড়াইলের বাসিন্দাদের কাছে এটি বড় স্বস্তি। তবে এই কর্মসূচি কতটা কার্যকর, কতটা টেকসই, আর এর বাস্তব প্রভাব কী—তা জানতে সরেজমিনে কথা বলা হয় একাধিক সুবিধাভোগীর সঙ্গে।

নিয়মিত আয় নয়, তবুও বড় সহায়তা

কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা বিউটি বেগম প্রায় ২৫ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও এখনো অন্যের বাসায় কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘এই বয়সে কাজ করা কষ্ট, কিন্তু না করলে চলবে না। এই টাকাটা পাইয়া একটু স্বস্তি পাইতাছি।’

তবে তিনি অতীত অভিজ্ঞতার কথাও মনে করিয়ে দেন—আগেও একবার কার্ড পেয়েছিলেন, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। ফলে নতুন কর্মসূচি নিয়েও তার মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে।

শিক্ষা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় প্রভাব

এই কর্মসূচির একটি ভিন্ন দিক উঠে আসে শিক্ষার্থী মিম আক্তারের কথায়। তার মায়ের নামে পাওয়া টাকায় তিনি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালাতে পারছেন। বললেন, ‘আমার যাতায়াত আর ফি এই টাকা দিয়াই হচ্ছে। আগে তা আমাকে আম্মা আর আব্বার কাছ থেকে নিতে হইতো।’

অন্যদিকে সাহিদা আক্তার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ থেকে পাওয়া এই অর্থ দিয়ে তার সন্তানের ছোট দোকানে পণ্য তুলেছেন। এতে পরিবারে অতিরিক্ত আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু ভোগ নয়— কিছু ক্ষেত্রে এই অর্থ বিনিয়োগেও ব্যবহার হচ্ছে।

জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই আলোকে সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের ১৪টি উপজেলায় (প্রতিটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে) প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবার প্রথমে এই সুবিধা পাচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ চার মাস। এটি সফল হলে ধাপে ধাপে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির স্লোগান হচ্ছে: ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এ লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি সুবিধাভোগীরা নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন কি না, সরকার তারও তদারকি করছে।

কারা পাচ্ছেন এই সুবিধা

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এই কার্ড মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারীদের জন্য। তবে মাঠপর্যায়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে।

কড়াইলের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এখনও অনেক যোগ্য পরিবার এই তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তথ্য সংগ্রহের সময় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একাধিক স্তরে যাচাই-বাছাই করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই ব্যক্তি যেন একাধিক সুবিধা না পান, সেদিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল পদ্ধতি: স্বচ্ছতা নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ

‘ফ্যামিলি কার্ডের’ টাকা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (নগদ/বিকাশ) মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমেছে—এটি ইতিবাচক দিক।

তবে ঝর্না বেগম নামে এক সুবিধাভোগী জানান, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে তারা পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। ফলে টাকা তোলা বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কখনো কখনো অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্বল্প সহায়তা, তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দৃষ্টান্ত

ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পটি মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়নের মূলধারায় আনার একটি বাস্তব প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

এই কর্মসূচির পাইলট পর্যায়ে ইতোমধ্যে হাজার হাজার নারী উপকৃত হচ্ছেন। ভবিষ্যতে এটি দেশের কোটি পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক তামান্না ইয়াসমিন বলেন, সরাসরি নগদ সহায়তা দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর হতে পারে, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

সরকার গৃহীত এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নারীর নামে কার্ড প্রদান। এতে তারা সরাসরি অর্থের নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নারীরা এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বিশেষ করে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসায়।

কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, নারীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিয়ে এই কর্মসূচি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। তারা এখন শুধু পরিবারের সদস্য নন, বরং পরিবারের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন।

মোছাম্মৎ কামরুন্নাহারের স্বামী অল্প বেতনের চাকরি করেন। তিনি বলেন, এই টাকায় বড় কিছু না হলেও উপকার হচ্ছে, কিন্তু সব সমস্যা তো আর শেষ হওয়ার নয়। আমি বাসায় ঘর-সংসার সামলাই। সে ক্ষেত্রে এটা আমার জন্য সরকারি আয়।

সরকারের এই উদ্যোগকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ।

তিনি বলেন, পরিমাণে সামান্য হলেও এটি নারীকে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি মাধ্যম করে তুলতে পারে। তবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিম্নআয়ের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা নিয়েও কাজ করতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মো. আব্দুল মালেক বলেন, কড়াইলের সরু গলিগুলোয় এখনো প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চলে। তবে সেই সংগ্রামের মাঝেই নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে এই আড়াই হাজার টাকা। ছোট এই সহায়তা বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে—যদি তা টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এটি মানুষের মনে আশা জাগায়।

‘কড়াইল বস্তির নারীদের জীবনে ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়—এটি তাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। সংগ্রামের ভেতরেও তারা এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারছেন। কারণ অনেকেই প্রাপ্ত টাকা খরচ না করে জমা করছেন।’

ড. মাহফুজ পারভেজ মনে করেন, এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তবে এটি শুধু দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রেই নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

দেশবার্তা/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
নির্বাচিত সংবাদ
লিমন-বৃষ্টি হত্যায় খুনের আগে ও পরে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেন ঘাতক
লিমন-বৃষ্টি হত্যায় খুনের আগে ও পরে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেন ঘাতক
শাহজালালসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার
শাহজালালসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার
হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
স্বত্ব © ২০২৫ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793725_Self-3.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793740_Self-4.jpg