ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে আজ সোমবার (৮ জুন) ৭.৮ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অধিকাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ভবন ধসে পড়া ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল সমুদ্রের নিচে হওয়ায় আশপাশের উপকূলে প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উচ্চতার সুনামি ঢেউ দেখা যায়। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুনামির আশঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানিয়েছে প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার।
দেশটির ভূমিকম্প সংস্থা জানিয়েছে, এ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৮। এটি সমুদ্রের নিচে ৩৩ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হয়, যার কেন্দ্রস্থল ছিল সারাঙ্গানি প্রদেশের মায়াসিম শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ৫৫ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী জেনারেল সান্তোস। ৭ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাসের এই শহরটি টুনা রপ্তানি ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক রড সস্মেনা জানিয়েছেন, কেবল জেনারেল সান্তোসেই অন্তত ৭ জন নিহত এবং প্রায় ১৩০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ কোটাবাটো, দাভাও অক্সিডেন্টাল প্রদেশ এবং বালুত দ্বীপে আরও ৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জেনারেল সান্তোসে কয়েকটি ছোট ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনায় বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়েছে। ম্যানিলার একটি রেডিওর চারতলা আঞ্চলিক কার্যালয় ভবনেরও আংশিক অংশ ধসে পড়েছে, তবে কর্মীরা দ্রুত নিচে নেমে আসায় কেউ আহত হননি।
আজ সোমবার গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে ফিলিপাইনের সব সরকারি স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছিল। সকালে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হলে ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে যায়। জেনারেল সান্তোসে ধসে পড়া একটি দোতলা স্কুলে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং জাতীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর পরই জেনারেল সান্তোসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সুরক্ষার স্বার্থে ১৭টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর ফিলিপাইনের সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানি প্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়। ফিলিপাইনের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের কাছে ৮৩ সেন্টিমিটার (২.৭ ফুট) উচ্চতার ঢেউ দেখা গেছে। মালয়েশিয়ার আবহাওয়া দপ্তরও বর্নিও দ্বীপের সাবাহ রাজ্যে সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। তবে সুনামির কারণে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের সময় গাড়িতে থাকা আঞ্চলিক পরিচালক রড সস্মেনা বলেন, আমার পিকআপ ভ্যানটি হঠাৎ এমনভাবে কেঁপে ওঠে যে ভেবেছিলাম টায়ার পাংচার হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মানুষ ঘর থেকে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
দাভাও শহরে অবস্থানরত আরেক কর্মকর্তা এডনার দায়াংহিরাং বলেন, মাটি যেভাবে কাঁপছিল, আমি ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলাম না, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিলাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিপাইন বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের 'রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০টি টাইফুন ও সামুদ্রিক ঝড় আঘাত হানে।
মূল ভূমিকম্পের পর ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ায় একাধিক আফটারশক (অনুকম্পন) অনুভূত হয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বর্তমানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন।
দেশবার্তা/একে