নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত তিনদিনব্যাপী জাতীয় ফল ও আম মেলাকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মেলার আয়োজন ও পরিচালনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড়।
অভিযোগ উঠেছে, মেলার নামে বরাদ্দ ব্যয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেই কৃষি বিভাগ উদ্বোধন ও ফটোসেশনে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে সরকারের কৃষকবান্ধব সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে মনে করছেন কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষক ও সচেতন নাগরিকরা। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চত্বরে আম মেলা এবং বদলগাছী কৃষি প্রশিক্ষণ হলরুমে ফল মেলার উদ্বোধন করা হয়। জেলা পর্যায়ের মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। অন্যদিকে বদলগাছী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত ফল মেলার উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি।
তবে উদ্বোধনের সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কয়েকজন কৃষকের উপস্থিতি দেখা গেলেও কিছুক্ষণ পর মেলা প্রাঙ্গণ প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। শুক্রবার (১৯ জুন) সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চত্বরে আয়োজিত মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। অধিকাংশ স্টলে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও দেখা যায়নি। মেলা থেকে বের হওয়ার সময় মাত্র একজন নারী দর্শনার্থীর দেখা মেলে।
অন্যদিকে বদলগাছী কৃষি প্রশিক্ষণ হলরুমে আয়োজিত ফল মেলার চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না সেখানে কোনো মেলা চলছে। প্রধান ফটক বন্ধ রেখে একটি ছোট গেট দিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দুইজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কিছু ফলের প্রদর্শনী এবং কয়েকটি খালি চেয়ার ছাড়া তেমন কোনো আয়োজন নেই। সেখানে কৃষক কিংবা কৃষি উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিও চোখে পড়েনি।
কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, এ ধরনের মেলা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে আয়োজন করা হলে এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। জেলা কৃষি অফিসের নির্জন পরিবেশ কিংবা উপজেলা কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ কক্ষে মেলার আয়োজন করায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়েছে। তাদের মতে, সরকারের কৃষিবিষয়ক প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে দায়সারাভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়নই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে। অনেকেই মেলার আয়োজনকে অকার্যকর ও জনবিচ্ছিন্ন বলে মন্তব্য করেছেন।
‘বদলগাছী পরিবার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মেলার ছবি পোস্ট করে তসলিম আলম নামে একজন লিখেছেন, “জাতীয় ফল মেলার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি শুধুমাত্র কিছু নির্বাচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আয়োজন করার যৌক্তিকতা কী? ফল উৎপাদন, বিপণন ও গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা গেলে অনুষ্ঠানটি আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে পারত। বদলগাছীর জিআই স্বীকৃত নাক ফজলি আমকে ব্র্যান্ডিং করারও এটি একটি ভালো সুযোগ ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারে না।”
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মেলা পরিদর্শনে আসা রমী রায় নামে এক নারী দর্শনার্থী বলেন, “ফেসবুকে দেখে মেলায় এসেছি। এখানে বিভিন্ন জাতের আম প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে মেলাটি মুক্তির মোড়, কেডির মোড় বা বিয়াম স্কুল প্রাঙ্গনের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে হলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতো।”
বদলগাছী উপজেলার তিলবদলী গ্রামের কৃষক খালেকুজ্জামান লিটন বলেন, “আমাদের এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে কখনো দেখিনি। ফল মেলার বিষয়েও জানতাম না। আপনাদের কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম কৃষি অফিসে এমন একটি মেলা হচ্ছে।”
তবে সমালোচনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবাব ফারহান বলেন, “মেলা আয়োজনের নির্দেশনা ছিল, আমরা সেটি বাস্তবায়ন করেছি। কৃষকরা আসবেন কি না, তা পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। তারপরও আমরা কৃষকদের মেলায় আসার জন্য অবহিত করছি।”
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে অফিসের বাইরে মেলার আয়োজন করা সম্ভব নয়। আর জেলা পর্যায়ের মেলায় যথেষ্ট কৃষকের উপস্থিতি রয়েছে। শুক্রবার সকালে দর্শনার্থী কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে উপস্থিতি বাড়বে বলে আশা করছি।”
জাতীয় ফল ও আম মেলার আয়োজন নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও জনসম্পৃক্ত আয়োজন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রতিনিধি/আরএইচ