মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আবারো কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি ধাক্কার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো রয়ে গেছে। তবে ধাক্কার একটি অংশ সামাল দিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা বিনিয়োগ। খবর এফটি।
আইএমএফের গত বুধবার প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তিন মাসের ব্যবধানে পূর্বাভাস আবারো কমানো হলো।
আইএমএফের মতে, ২০২৭ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে এটিও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গড় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে থাকবে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। চলতি বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ২০২৫ সালে যা ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর ২০২৭ সালে তা কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক পেতিয়া কোয়েভা ব্রুকস বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি বিপরীতমুখী দুটি শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই খাতে বিনিয়োগের দ্রুত বৃদ্ধি। এ বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি।
আইএমএফ জানায়, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী মার্চের মধ্যে পরিস্থিতি যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি ফিরবে। তবে বাস্তবে এখনো ওই পথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় পরিবহন কার্যক্রম সীমিত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জলপথটি দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৪১টি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এ পথে যাতায়াত করত। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এ উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও।
জ্বালানি তেলের দাম গত সপ্তাহে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে নেমে এলেও যুক্তরাষ্ট্র ফের ইরানে হামলা করলে এর দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার জানান, তার ধারণা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
এরপর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একপর্যায়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারের বেশি হয়। পরে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ফিউচারের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার ৭৬ সেন্ট, যা আগের সপ্তাহের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ ডলার বেশি।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমে আসবে বলে ধারণা তৈরি হয়েছিল বাজারে। সে প্রত্যাশা থেকেই তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে নেমে যায়। কিন্তু নতুন করে সংঘাত বাড়ায় সে ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে।’
দেশভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২৬ সালে দেশটির জিডিপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। অন্যদিকে ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৯ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ১ শতাংশ, কানাডার ১ দশমিক ১ শতাংশ ও জাপানের দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া চীনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আইএমএফ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। একই সময় এআই-নির্ভর বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করলেও সামনের পথ এখনো অনিশ্চিত। তাই আগামী মাসগুলোয় ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশবার্তা/এমআর