ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  শনিবার | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০:৩৯
চলমান বার্তা:
মেয়াদ পূর্তির আগেই রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়েছেন যারা
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৫৫  (ভিজিটর : )

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একাধিকবার এই পদে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ, গণ-অভ্যুত্থান, দলীয় চাপ এবং সাংবিধানিক সংকটের কারণে কয়েকজন রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির আগাম বিদায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছয়জন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন। প্রতিটি পদত্যাগই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছা পদত্যাগের ঘটনা।

এরপর ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় আগাম পদত্যাগের ঘটনা ঘটে বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরীর ক্ষেত্রে। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও, এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৮৩ সালের ১০ ডিসেম্বর আহসান উদ্দিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন।

চতুর্থ বড় ঘটনা ঘটে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

২০০২ সালে আবারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে তার মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত ২১ জুন তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এটি ছিল সংসদীয় রাজনীতিতে দলীয় চাপের কারণে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

সর্বশেষ আলোচনায় আসে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা উঠে আসে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে আগাম পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের আগাম পদত্যাগের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক হস্তক্ষেপ, গণ-আন্দোলন কিংবা দলীয় সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোরও সাক্ষ্য বহন করে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং ক্ষমতার রূপান্তরের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

দেশবার্তা/এসআইএস/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।