দৃশ্যপট—১
১৯৭১ সালের মার্চ মাস: পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট অধিবেশন বাতিল করেন। এতে উত্তাল ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা। ’৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে ৩ মার্চ ঢাকার পূর্বানী হোটেলে শেখ মুজিব বৈঠক করেন। তখন এর বাইরে স্বাধীনতাকামী সাধারণ জনতা প্রবল ভিড় করে, তারা মুজিবের মুখ থেকে কথা শুনতে চায়। কিন্তু মুজিব কথা বলতে অস্বীকার করেন। মানুষ গড়াগড়ি দিয়ে রাস্তায় কান্নাকাটি করে। তোফায়েল আহমদসহ কয়েকজন নেতা এসে তাদের বোঝান, ৭ মার্চ মুজিব কথা বলবেন।
দৃশ্যপট—২
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুজিব লাখো মানুষের সামনে বক্তব্য দেন। সমগ্র জাতি এ সময় অপেক্ষায় ছিল স্বাধীনতার ঘোষণার, কিন্তু তিনি তা না দিয়ে পাকিস্তানের শাসকদের কাছে ৪টি শর্ত দিয়ে পরিষদে যাওয়ার ঘোষণা দেন:
১. সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
২. সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।
৩. বিভিন্ন স্থানে হত্যার বিচার করতে হবে।
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
ভাষণে যদিও “এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম… আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” বলেন, কিন্তু তা শেষ করেছিলেন “জয় পাকিস্তান” বলে। এর দ্বারা তিনি আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন।
দৃশ্যপট—৩
মার্চ ১৬ থেকে মার্চ ২৪ পর্যন্ত ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিব দফায় দফায় বৈঠক করেন। সেই বৈঠক সফল বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন মুজিব। ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে ইয়াহিয়ার সঙ্গে ঐকমত্য স্থাপিত হয়। ঐ সমঝোতায় ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট রেখে মুজিব সরকার গঠন করতে রাজি হন, যাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৫ জন করে মন্ত্রী থাকবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি সই করতে ইয়াহিয়ার প্রতিনিধি পীরজাদা কর্তৃক মুজিবের প্রতিনিধি ড. কামাল হোসেনকে ফোন করার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ পিন্ডি চলে যান।
দৃশ্যপট—৪
পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত ন্যাপ নেতা খান ওয়ালী খান পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং ২২ মার্চ ১৯৭১ শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন। সাক্ষাৎকালে তিনি জানতে চান, তিনি (মুজিব) এখনও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন কি না। জবাবে মুজিব বলেছিলেন, “খান সাহেব, আমি একজন মুসলিম লীগার।”
২৫ মার্চ, আমেরিকার NBC টেলিভিশনকে দেওয়া মুজিবের একটি সাক্ষাৎকার ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রচারিত হয়। তাতে মুজিবকে প্রশ্ন করা হয়—Do you mean Independence? মুজিব জবাব দেন, “No, I don’t mean that, I want autonomy. It can be achieved many ways.”
দৃশ্যপট—৫
২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বত্রিশ নম্বরে এসে মুজিবকে সম্ভাব্য আক্রমণের কথা জানাচ্ছিলেন। একে একে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, ড. কামাল হোসেন, পাকিস্তানি সাংবাদিক তারিক আলী, ক্যাপ্টেন রহমান, আঃ রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ দেখা করেন। তারা শত অনুরোধ করেও মুজিবকে আত্মগোপনে যেতে রাজি করাতে পারেননি।
২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ড. কামাল যখন শেখ মুজিবের কাছ থেকে বিদায় নিতে যান, তখনও শেখ মুজিব তার কাছে জানতে চান, পীরজাদার সেই টেলিফোনটি এসেছে কি না। কামাল তাকে জানান, না, ফোন আসেনি। এতে মুজিব হতাশ হয়ে পড়েন।
এর আগে সন্ধ্যা ৭টার পর দলীয় সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ একটি টেপরেকর্ডার নিয়ে মুজিবের বেডরুমে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করতে চেষ্টা করেন। তিনি দেখতে পান, বেগম মুজিব ঢোলা পাজামায় ফিতা লাগাচ্ছেন। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করাতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, “এরকম কোনো রেকর্ড থাকলে পাকিস্তানিরা আমাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় ঝুলিয়ে দিতে পারবে।”
তিনি তাজউদ্দিনকে বলেন, “২৭ তারিখে হরতাল ডাকছি, যাও, বাড়িতে গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও।” এছাড়াও উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
দৃশ্যপট—৬
২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরে মুজিব তার বাসভবনেই ছিলেন। পাক বাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে মেজর জেড এ খান শেখ মুজিবকে জীবিত আটক করতে ৩ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে অভিযান চালান। একই সময়ে রাজধানীসহ বড় বড় শহরে শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইট—বাঙালি নিধনে মেতে ওঠে ইয়াহিয়ার হানাদার বাহিনী।
জেড এ খানের বাহিনী মুজিবকে আটক করে। আটক করার আগমুহূর্তে একটি গ্রেনেড ছোড়া হলে মুজিব ভয়ে কম্পমান অবস্থায় বলেন, তাকে হত্যা করা হবে না—এমন প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি বেরিয়ে আসবেন। এছাড়াও বলেন, “এত গোলাগুলির কোনো প্রয়োজন ছিল না, বরং আমাকে খবর দিলেই আমি হাজির হয়ে যেতাম!” অযথা সময় নষ্ট করার কারণে আটক করার পর মুজিবের গালে একটি থাপ্পড় বসান হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির।
গাড়িতে তুলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে। সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টে টিক্কা খানের বাড়ির গেস্টরুমে এক রাত রাখা হয়। পরে একটি স্কুল ভবনের তৃতীয় তলায় আরও কয়েকদিন রাখা হয়।
দৃশ্যপট—৭
কড়া গোপনীয়তায় সামরিক ব্যবস্থায় ১ এপ্রিল ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে যাওয়া হয় মুজিবকে। সেখান থেকে মিয়ানওয়ালি জেলে পাঠানো হয়। মাঝে মাঝে লায়ালপুর কারাগারেও (বর্তমানে ফয়সালাবাদ সেন্ট্রাল জেল) রাখা হয়।
মিয়ানওয়ালি পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে অবস্থিত, ইয়াহিয়া খানের নিজ এলাকা। সেখানে শেখ মুজিবের জন্য দু’জন পরিচারক ও পছন্দের খাবার রান্নার জন্য বাবুর্চি দেওয়া হয়েছিল। রেডিও ও পত্রিকা পড়ার সুযোগ ছিল, গভর্নরের লাইব্রেরিতে পড়াশোনার সুযোগও ছিল।
জেলে থাকতে মুজিব তার পরিবারের চিন্তায় মগ্ন হয়ে ওঠেন। তবে কারা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খবর পান, তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মাধ্যমে মাসিক ১৫০০ রুপি ভাতার ব্যবস্থা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতে তিনি স্বস্তি বোধ করেন।
সেখানেই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে (মোট ১২টি অভিযোগ) মামলা করা হয়। সরকারি খরচে তার পছন্দের আইনজীবী এ কে ব্রোহীকে দেওয়া হয়। পরে ১৯৮৭ সালে এ কে ব্রোহী তার জীবনসায়াহ্নে লন্ডনের ইমপ্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুটি তথ্য প্রকাশ করেন:
১) মুজিব অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন এবং সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি কখনো পাকিস্তান ভাঙার মতো কোনো কাজ করেননি।
২) পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রেডিও-টিভিতে বক্তব্য দিতে ইয়াহিয়াকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
দৃশ্যপট—৮
লায়ালপুর কোর্টে মুজিবকে বহুবার হাজির করা হয়। তিনি ২১ বার হলফনামা দিয়ে বলেন যে, তিনি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রতি অনুগত এবং পূর্ব পাকিস্তানে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে, তার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
দৃশ্যপট—৯
১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে ভারতীয় বিমান হামলার ভয়ে মিয়ানওয়ালি জেলে ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়। মুজিবের নিরাপত্তায় জেলের কর্মকর্তারা ট্রেঞ্চ মহড়া দেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর তিনি বলেন, তাকে ফাঁসি দিয়ে সেখানে কবর দেওয়া হতো—এমন গল্প প্রচার করেন।
দৃশ্যপট—১০
১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার খবর শুনে মুজিব অস্থির হয়ে ওঠেন। কারাগারের ভেতরেই সেজদায় পড়ে কান্নাকাটি করেন—“ইয়া আল্লাহ, এ তো আমি চাইনি!” … “তাজউদ্দিন বদমাশ, গড়বড় করেছে”… আরও বলেন, “ইয়াহিয়া গাদ্দার, ইন্ডিয়ার এজেন্ট। পাকিস্তান বরবাদ করতে চায়!” আমি পাকিস্তানের জন্য মুশাকাত করছি, আমাকে খামাখা এখানে আটক রাখা হয়েছে!”
দৃশ্যপট—১১
২২ ডিসেম্বর ’৭১ মুজিবকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে হাউস অ্যারেস্টে রাখা হয়। এরপর তাকে শিহালা পুলিশ রেস্ট হাউজে আনা হয়। সেখানে পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট ভুট্টো তার সঙ্গে বৈঠক করতে আসেন।
২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠকে মুজিব তাকে আশ্বাস দেন, “পাকিস্তান একটি কনফেডারেশন হবে… এটা তোমার আর আমার মধ্যে… বিষয়টা আমার ওপর ছেড়ে দাও… আমাকে বিশ্বাস করো… আমরা একত্রে থাকব এবং শাসন করব। তুমি জানো, সেখানে ভারতীয় আর্মি আছে।”
সেই বৈঠকেই ভুট্টোর কাছে মুজিব জানতে চান, “তুমি কী করে প্রেসিডেন্ট হলে? আমি মেজরিটি পার্টির নেতা—প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা আমার!” ভুট্টো বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয়েছে।
মুজিব লাফিয়ে উঠে বলেন—“এটা কী করে সম্ভব? আমাকে টিভি-রেডিওতে নিয়ে চলো, আমি ঘোষণা দেব, পূর্ব পাকিস্তানই থাকবে!”
এরপর একই রেস্ট হাউজে ড. কামাল হোসেনকে এনে মুজিবের সঙ্গে রাখা হয়।
দৃশ্যপট—১২
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে মুজিবকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন ভুট্টো। ৬ জানুয়ারি তার কাছে দর্জি পাঠিয়ে নতুন পোশাকের মাপ নেওয়া হয়। পাকিস্তানের পাসপোর্ট তৈরির জন্য ছবি তোলা হয়। বিদায় কালে ভুট্টো তাকে গরম কাপড়, প্রিন্স কোট ও প্রিয় এরিনমোর তামাক উপহার দেন।
পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে মুজিব পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে ৮ জানুয়ারি লন্ডনে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন ড. কামাল হোসেন। দুই দিন পরে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানে করে দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ঢাকায় ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন। সেখান থেকেই ভুট্টোর উদ্দেশ্যে বলেন, “আমাদের মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক (কনফেডারেশন) সম্ভব নয়। আপনারা ভালো থাকুন।”
লেখক: সরকারের সিনিয়র সচিব